শিরোনাম
◈ তোফায়েলের জানাজা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, মুখ খুললেন হাছান মাহমুদ ◈ ন‌ভেম্ব‌রে ঢাকায় পুরুষ‌দের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল, থাক‌বে‌ ভিআরএস প্রযু‌ক্তি  ◈ হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন ইসরায়েলি শীর্ষ কর্মকর্তা ◈ ৬ নবজাতকের মৃত্যুর দায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ◈ নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফে অসন্তোষ, বিইআরসিকে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ মন্ত্রণালয়ের ◈ ‘আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’, মায়ের মৃত্যু নিয়ে প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন নিহতের ছোট ছেলে বুয়েট অধ্যাপক ◈ কুমির সরিয়ে নেওয়া ঠিক হয়নি, মাজারের দিঘিতে ফেরত চাইলেন খাদেম ◈ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ বিশ্বকাপ মোবাইলে খেলা দেখবেন যেভাবে ◈ ইরান অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা, আর ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র: রুবিও ◈ স্বামী-সন্তান কানাডা প্রবাসী, সেই মিরপুরেই মিলল আরেক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ

প্রকাশিত : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:১৭ দুপুর
আপডেট : ১৫ মে, ২০২৬, ০৮:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নীরব জোনে তীব্র শব্দসন্ত্রাস: শাহবাগসহ ঢাকাজুড়ে বাড়ছে শব্দদূষণ, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

শুধু শাহবাগ এলাকা নয়, ঢাকার নীরব জোন ঘোষিত সব এলাকাতেই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে শব্দদূষণ। এটি রোধে সরকার ঢাকার ১২টি এলাকাকে নীরব জোন ঘোষণা করে। এসব এলাকায় শব্দদূষণ প্রতিরোধে গত বছরের নভেম্বর থেকে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি; কোনো এলাকাতেই কমেনি শব্দদূষণ। বরং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

রাজধানীর ব্যস্ততম শাহবাগ মোড়। এক পাশে বারডেম হাসপাতাল, আরেক পাশে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল। এ দুই হাসপাতাল এলাকা আইনত ‘নীরব জোন’; এখানে হর্ন বাজানো বা উচ্চ শব্দ দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ যানজটে আটকে থাকা গাড়ির হর্নের তীব্র শব্দে কান পাতা দায়। সড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য আর পথচলতি মানুষজন তো বটেই, হাসপাতালের ভেতরে চিকিৎসাধীন রোগীরা পর্যন্ত এই শব্দসন্ত্রাসের শিকার। সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং চালকদের মধ্যে সচেতনতার অভাবই শব্দদূষণের প্রধান কারণ। অনেক চালক মনে করেন হর্ন বাজালেই জ্যাম ছুটে যাবে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়িতে উচ্চ শব্দের হর্ন এবং যত্রতত্র মাইক বাজানোর সংস্কৃতি এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলছে। আবাসিক এলাকাগুলো বাণিজ্যিক এলাকায় রূপান্তর হওয়ায় দিন-রাত সবসময়ই জেনারেটর বা নির্মাণকাজের শব্দে অতিষ্ঠ নাগরিক জীবন। দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকলে মানুষের শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

জাতীয় নাক, কান ও গলা ইনস্টিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. হাসান জাফর আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের শ্রবণশক্তির নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে। সেটা হলো ২০ থেকে ৩০ সর্বোচ্চ ৪০ ডেসিবল। ৫০ থেকে ৬০ ডেসিবল শব্দ হলেই কানে পেইন হয়। এটা কান নিতে পারে না। কিন্তু আমরা জোর করে শোনাচ্ছি। এটা দীর্ঘমেয়াদে শ্রবণশক্তির মারাত্মক ক্ষতি করে। এ ছাড়া শব্দদুষণ আমাদের বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে, মানসিকভাবে অস্থিরতা তৈরি করে। যারা উচ্চ শব্দের মধ্যে বিভিন্ন কাজ করেন, তারা একটা পর্যায়ে জোরে কথা না বললে শুনতে পান না। তিনি বলেন, শব্দদূষণ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। উচ্চমাত্রার শব্দে দীর্ঘসময় অবস্থান করলে শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। আমরা সাম্প্রতিক সময়ে কানের সমস্যার যেসব রোগী পাচ্ছি, তাদের একটা বড় অংশই শব্দদূষণের শিকার।

বাংলাদেশের নগর এলাকায় শব্দদূষণের উৎস বহুমাত্রিক। এর মধ্যে গাড়ির অতিরিক্ত হর্ন বাজানো শব্দদূষণের অন্যতম বড় উৎস। এ ছাড়া বড় বড় ভবন নির্মাণ, সড়ক সংস্কার ও ড্রিলিং কাজ থেকে সৃষ্ট উচ্চশব্দ আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী বিরক্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকার কাছাকাছি কারখানার যন্ত্রপাতি, জেনারেটর ও ভারী যান্ত্রিক কার্যক্রম থেকে একটানা শব্দ সৃষ্টি হয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সভা, প্রচার কার্যক্রম ও বাণিজ্যিক প্রচারণায় লাউডস্পিকার ব্যবহারের ফলে শব্দের মাত্রা অনেক সময় অনুমোদিত সীমা ছাড়িয়ে যায়।

ট্রাফিক পুলিশ সূত্র বলছে, গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মহানগরে শব্দদূষণের বিরুদ্ধে ১৬ হাজার ৭২টি মামলা করা হয়েছে। এর বিপরীতে জরিমানা করা হয়েছে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৫০০ টাকা। এর মধ্যে ৭২ লাখ ৪১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অ্যাডমিন) মো. সরওয়ার আমাদের সময়কে বলেন, ‘নীরব জোন’ ঘোষিত এলাকায় শব্দদূষণ রোধে আরও বেশি মামলা দায়েরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিও মামলা করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কোনো গাড়ির ড্রাইভার ‘নীরব জোন’ এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত হর্ন বাজালে শব্দসহ ভিডিও হয়ে যাবে। সেই ভিডিও দেখে আমরা গাড়ির মালিকের ঠিকানায় মামলার কাগজ পাঠানোর চিন্তাভাবনা করছি।

বাংলাদেশে ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০২৫’ অনুযায়ীÑ হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এসব এলাকার বাস্তব চিত্র ভয়াবহ। বিধিমালা অনুযায়ী, নীরব এলাকায় দিনে শব্দের সর্বোচ্চ সীমা ৫০ ডেসিবল এবং রাতে ৪০ ডেসিবল হওয়ার কথা। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, ঢাকার নীরব এলাকাগুলোয শব্দের মাত্রা অনেক সময় ১০০ ডেসিবল ছাড়িয়ে যায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে সচিবালয় ও আশপাশের এলাকা এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও তৎসংলগ্ন এলাকার শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ‘নীরব জোন’ ঘোষণা করা হয়। ঢাকঢোল পিটিয়ে ওই এলাকায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত অভিযান ও জনসচেতনতামূলক সমাবেশের নেতৃত্ব দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এসব এলাকায় শব্দদূষণ ঠেকাতে একের পর এক মামলাও করা হয়। কিন্তু শব্দদূষণের মাত্রা একটুও কমেনি। আগের মতোই ভয়াবহ শব্দদূষণ হচ্ছে সচিবালয় ও বিমানবন্দর এলাকায়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, শব্দদূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। শব্দদূষণের উৎসে গিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা গাড়ির হাইড্রোলিক হর্নের আমদানি নিষিদ্ধ করতে বার বার বলে আসছি, কিন্তু তা আমদানি অব্যাহত রয়েছে। ফলে হাইড্রোলিক হর্নের মাধ্যমে শব্দদূষণ অব্যাহত রয়েছে। শব্দদূষণ আমাদের শ্রবণশক্তির মারাত্মক ক্ষতি করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী এখন থেকে ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্টরা ঘটনাস্থলেই শব্দদূষণকারীর বিরুদ্ধে জরিমানা করার ক্ষমতা পাচ্ছেন। এর আগে এটি পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। নতুন আইনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বা অহেতুক হর্ন বাজালে বড় অঙ্কের জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি বারবার আইন লঙ্ঘন করলে চালকের লাইসেন্স বাতিল বা নবায়নে বাধার সম্মুখীন হতে পারে।

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক সমীক্ষা বলছে, যানবাহনের শব্দদূষণের কারণে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশের সাধারণভাবে মোবাইল ফোনে কথা শুনতে অসুবিধা হয়, ১৯ দশমিক ১ শতাংশকে ঘরের অন্য সদস্যদের তুলনায় বেশি ভলিউম দিয়ে টিভি দেখতে হয়, উচ্চস্বরে কথা না বললে তাদের কথা শুনতে কষ্ট হয়, ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ উচ্চস্বরে কথা না বললে শুনতে পান না এবং ৮ দশমিক ২ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ কয়েক ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের পর মাথা ঘোরা, বমি ভাব ও ক্লান্তিজনিত সমস্যায় ভোগেন।

ঢাকায় কর্মরত পুলিশ সার্জেন্ট মেহেদী হাসান গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, সার্জেন্ট হিসেবে রাস্তায় দায়িত্ব পালনের কিছুদিন পর থেকেই আমি শব্দ ও বায়ুদূষণের শিকার। রাতে বাসায় যাওয়ার পর মাথাব্যথা করে। ঠিকমতো ঘুম হয় না। আর যেসব ট্রাফিক পুলিশ সদস্য দীর্ঘদিন রাস্তায় দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের শ্রবণশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হচ্ছে। জোরে কথা না বললে তারা শুনতে পান না।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়