মনজুর এ আজিজ : বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময় পার করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘায়িত যুদ্ধ কেবল একটি অঞ্চলের মানচিত্র নয়, বরং বদলে দিচ্ছে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সমীকরণও। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে এই যুদ্ধের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের উপকূলেও। রপ্তানি আদেশ হ্রাস, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার মতো বহুমুখী চাপের মুখে দাঁড়িয়ে আছে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প। তবে ইতিহাসের প্রতিটি সংকটে বাংলাদেশ যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এবারও সেই অদম্য স্পৃহা আর কৌশলগত প্রস্তুতিতে অন্ধকারের মাঝে ইতিবাচক আলোর দেখা মিলছে।
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা এবং শিপিং রুটে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে ভোক্তা চাহিদা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত তিনটি পথে এই সংকটের প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে: জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, লজিস্টিকস খরচ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩৫০ কোটি ডলার, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতেও কিছুটা নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার এক সাহসী গল্প।
বিজিএমইএ-র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার প্রভাব পোশাকখাতে পড়তে শুরু করলেও এখন পর্যন্ত কোনো বড় অর্ডার বাতিল হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এটি একটি অত্যন্ত পজিটিভ দিক। বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল না করে বরং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এর অর্থ হলো- বাংলাদেশের পণ্যের প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অগাধ আস্থা এখনো অটুট। মহিউদ্দিন রুবেল আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে এখনো অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। এটি আমাদের উৎপাদনকারীদের জন্য একটি বড় স্বস্তি। সরকারের এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত শিল্পকারখানাগুলোকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার রসদ জোগাচ্ছে।
শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি বর্তমানে এয়ার কার্গো সংকটের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসূর জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য যেত, এখন তা অনেক কমে গেছে। এয়ার ফ্রেইট ব্যয় বাড়ার ফলে ব্যয় বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু উদ্যোক্তারা বসে নেই। তারা এখন দুবাই বা দোহার বিকল্প হিসেবে নতুন ট্রানজিট রুট এবং নৌ-পথের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী রপ্তানি সচল রাখার পরিকল্পনা করছেন। এই উদ্ভাবনী চিন্তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের লজিস্টিকসখাতকে আরো শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, চামড়া শিল্পে নতুন অর্ডারের গতি কিছুটা ধীর। তবে এই বিরতিকে কাজে লাগিয়ে অনেক ট্যানারি মালিক তাদের কারখানার আধুনিকায়ন এবং কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে মনোযোগ দিচ্ছেন। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, পরিবহন সময় বা লিড টাইম বাড়লেও বাংলাদেশের পণ্যের গুণগত মান অনন্য। তাই সাময়িক দেরি হলেও ক্রেতারা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেই ফিরবেন।
স্বস্তির বাতাস বইছে রেমিট্যান্সে: রপ্তানি আয়ে কিছুটা ধীরগতি থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি ‘প্রবাসী আয়’ বা রেমিট্যান্স এক অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ ২১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটিই বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রপ্তানি আয়ের সাময়িক ঘাটতি পূরণ করতে এবং ডলারের রিজার্ভকে স্থিতিশীল রাখতে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এই সংকট আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। তিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারি খাত ইতোমধ্যে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে: ১. বিকল্প শিপিং রুট: হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প নৌ-পথ ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ২. পণ্যের বৈচিত্র্য: কেবল পোশাক নয়, বরং চামড়া, ওষুধ ও প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে নতুন নতুন প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। ৩. জ্বালানি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশের উৎপাদন খাতকে সচল রাখতে জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ করা হচ্ছে। চীনের ডেনিম ও টেক্সটাইল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ এখন শীর্ষস্থান দখল করেছে।
এটি প্রমাণ করে যে, বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় যখন বড় বড় দেশগুলো পিছিয়ে পড়ছে, বাংলাদেশ তখন তার নির্ভরযোগ্যতা দিয়ে নতুন বাজার দখল করছে। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সাপ্লাই চেইন পুনর্বিন্যাস বাংলাদেশকে ‘সোর্সিং হাব’ হিসেবে আরো শক্তিশালী করছে।