শিরোনাম
◈ মার্কিন অবরোধের প্রভাব: ভিসা-মাস্টারকার্ড লেনদেন স্থগিতের ঘোষণা কিউবার ◈ মেডিকেলের ছাত্রীরা বছরের পর বছর যৌন হয়রানির শিকার, কমপক্ষে ৩০ জনের অভিযোগ ◈ দ‌ক্ষিণ আ‌ফ্রিকার টি-টোয়েন্টিতে খেল‌বেন রিশাদ হো‌সেন! ◈ ১৩ বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মা‌টি‌তে ওয়ান‌ডে জ‌য়ের স্বাদ পে‌লো  শ্রীলঙ্কা ◈ নতুন-পুরনো সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা: এনআইডি ব্লকের প্রস্তুতি, নতুন তালিকা হচ্ছে, নজরদারিতে স্বজনরাও ◈ বিদ্যুৎ দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে আজ সারা দেশে জামায়াতের বিক্ষোভ ◈ বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ড সফ‌রে যাচ্ছে ◈ লিও‌নেল মে‌সি স্পেনের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জিতলেন, বা‌র্সেলোনার অভিনন্দন ◈ রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলা: যুক্তিতর্ক শুনানি আজ ◈ মমতার বিস্ফোরক মন্তব্যেও নীরব দিল্লি, বক্তব্য নেই বিজেপির

প্রকাশিত : ১৭ মে, ২০২৬, ১০:২৩ রাত
আপডেট : ০৪ জুন, ২০২৬, ১২:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ ও ২০ খাতে কর অবকাশ ফেরানোর পরিকল্পনা

আগামী জাতীয় বাজেটে আবাসন খাতে পূর্ণ দায়মুক্তিসহ অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা বিনিয়োগের বিতর্কিত সুযোগটি আবারও ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে সরকার।

বাজেট আলোচনার বিষয়ে অবহিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা 'দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড'কে জানিয়েছেন, সরকার মনে করছে প্রস্তাবিত এই সুবিধা—যা বিনিয়োগকারীদের অর্থের উৎসের বিষয়ে যেকোনো ধরনের তদন্ত থেকে সুরক্ষা দেবে—অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, "অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ আসতে পারে। তবে এটি কী ফরম্যাটে হতে পারে, ট্যাক্স রেট কেমন হবে - তা এখনো ঠিক হয়নি।"

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই সুবিধা চালু করা হয়েছিল। পরবর্তীতে অর্থনীতিবিদ এবং সুশীল সমাজের তীব্র সমালোচনার মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটি বাতিল করে। সমালোচকরা এই পদক্ষেপকে অনৈতিক ও বৈষম্যমূলক বলে অভিহিত করেছিলেন।

এছাড়া ওষুধ, অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই), কৃষিখাত, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদনমুখী শিল্পসহ ২০টিরও বেশি খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য 'ট্যাক্স হলিডে' বা কর অবকাশের আদলে কর ছাড়ের সুবিধা পুনর্বহালের কথাও ভাবছে সরকার। বিগত বাজেটে এই প্রণোদনাগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মূলত অর্থনীতিতে গতি আনতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার অংশ হিসেবে এ কর ছাড়ের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।"

দায়মুক্তি ধারা নিয়ে বিতর্ক

এই অর্থের উৎস বিষয়ে কোন সংস্থা প্রশ্ন করতে পারবে না, বলে যে বিধান এর আগের সরকারের সময়ে ছিলো সেটি ফিরিয়ে আনা হতে পারে বলেও জানান এনবিআরের একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, "যদি কোন সংস্থার প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে, তাহলে তো কেউ বিনিয়োগ করতে চাইবে না।"

অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, " অর্থের উৎস প্রকাশের ক্ষেত্রে পূর্ণ দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) দিয়েই এই সুবিধা চালু করা হতে পারে। কেননা ইনডেমনিটি না দিলে ট্যাক্স কমিয়ে দিলেও— ভবিষ্যত ঝুঁকির কারণে কেউ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন না।"

সাম্প্রতিক সময়ের বাজেট আলোচনায় আবাসনখাতের ব্যবসায়ীরা কালো টাকা বিনিয়োগের সুবিধা পুনর্বহালের দাবি তুলেছেন। তবে গত দুই মাসে বাজেট নিয়ে একাধিক আলোচনায়— এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অনাগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন।

কর্মকর্তাদের মতে, সুবিধাটি আবারও চালু করা হলে করের হার কেমন হবে—সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিষয়টি এনবিআরের পর্যালোচনায় রয়েছে।

এদিকে সমালোচকদের মতে, এই সুবিধা পুনর্বহাল করা হলে তা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের পরিপন্থী হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,  দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত একটি সরকারের জন্য এই সুবিধাটি আবার চালু করা হবে "আত্মঘাতী"।

টিবিএসকে তিনি বলেন, "নির্বাচনি ইশতেহারে এ সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কমিটমেন্ট করেছে। ফলে কালো টাকা সাদা করার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না।"

"কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দুর্নীতির সহায়ক, বৈষম্যমূলক, এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক" –উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এ সুযোগ দেওয়া হলে তারা জনগণকে কী জবাব দেবে?"

কালো টাকা সাদা করার সুযোগের ইতিহাস

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সরকার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে এসেছে। তবে গত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরে মাত্র ১০ শতাংশ কর এবং দায়মুক্তি দিয়ে ঢালাওভাবে এ সুবিধা দেয়। অর্থাৎ একজন স্বাভাবিক করদাতা যেখানে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর দিতে, আর কালো টাকার মালিককে সে সুযোগ দেওয়া হয় মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই সময় তীব্র সমালোচনা হয়।

ওই অর্থবছরে দেশের ইতিহাসের এক বছরে সর্বোচ্চ ১১,৮৩৯ জন ব্যক্তি প্রায় ২০,৫০০ কোটি টাকা সাদা করেছিলেন। এই বিনিয়োগ থেকে এনবিআর ২,০৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছিল। মোট অর্থের মধ্যে এনবিআরের সাময়িক বিধানের আওতায়, ব্যাংকে নগদ জমা বা নগদ আকারে থাকা ১৬,৮৩০ কোটি টাকা বৈধ করেছিলেন ৭,০৫৫ জন অপ্রদর্শিত অর্থের মালিক। বাকি টাকা জমি, ফ্ল্যাট ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছিল।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ কর হারে এই সুবিধাটি আবারও চালু করা হয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যায়ক্রমে এই সুবিধা, বিশেষ করে দায়মুক্তির বিধানটি প্রত্যাহার করে নেয়।

বর্তমানে যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে, তবে সেজন্য প্রযোজ্য হারে কর অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এবং এবং প্রযোজ্য করের এর ওপর ১০ শতাংশ জরিমানা গুণতে হয়।

কিন্তু, দায়মুক্তি দেওয়া হলে কর কর্তৃপক্ষের বাইরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-সহ সরকারের কোন সংস্থা ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারে না।

যেসব খাত পেতে পারে কর ছাড়ের সুবিধা

কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ৩২টি খাত কর অবকাশ সুবিধা পেত, যা গত বছর বাতিল করে দেওয়া হয়। এ খাতগুলোর মধ্যে এ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রেডিয়েন্ট ও রেডিও ফার্মাসিউটিক্যালস; কৃষি যন্ত্রপাতি, অটোমোবাইল; ব্যারিয়ার কন্ট্রাসেপটিভ ও রাবার ল্যাটেক্স; ইলেক্ট্রনিক্সের মৌলিক উপাদান অর্থাৎ রেজিস্টর, ক্যাপাসিটর, ট্রানজিসটর, ইনটিগ্রেটেড সার্কিট, মাল্টিলেয়ার পিসিবি উৎপাদনখাতের মত কিছু খাতে—নতুন বিনিয়োগে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হ্রাসকৃত হারে কর সুবিধা পেতে পারে।

এই তালিকায় আরও যুক্ত হতে পারে বাইসাইকেল ও এর খুচরা যন্ত্রাংশ; জৈব সার; জৈব প্রযুক্তি-ভিত্তিক কৃষি পণ্য; বয়লার; কম্প্রেসর ও এর যন্ত্রাংশ; কম্পিউটার হার্ডওয়্যার; হোম অ্যাপ্লায়েন্স; কীটনাশক ও বালাইনাশক; চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য; স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ; পেট্রোকেমিকেলস; ফার্মাসিউটিক্যালস; প্লাস্টিক রিসাইক্লিং; টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি; খেলনা উৎপাদন; টায়ার উৎপাদন; বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার; এবং অটোমোবাইল পার্টস ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন।

এছাড়া অটোমেশন ও রোবোটিক্স ডিজাইন, ম্যানুফ্যাকচারিং ও এর পার্টস ও উপাদানসহ; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক সিস্টেম ডিজাইন এবং ম্যানুফ্যাকচারিং; ন্যানোটেকনোলজি ভিত্তিক পণ্য উৎপাদন এ সুবিধার আওতায় আসতে পারে।

অবশ্য কত বছরের জন্য বা কত শতাংশ হারে এ কর সুবিধা দেওয়া হবে তা জানা যায়নি।

এর আগে সংশ্লিষ্ট খাতগুলো এমন একটি কর অবকাশ আওতায় যোগ্য বলে বিবেচিত হতো, যার অধীনে তারা বাণিজ্যিক উৎপাদনের প্রথম দুই বছর আয়ের ওপর প্রযোজ্য করে ৯০ শতাংশ ছাড় পেত—অর্থাৎ তাদের মোট কর দায়ের মাত্র ১০ শতাংশ পরিশোধ করতে হতো। এরপর তৃতীয় ও চতুর্থ বছরে ৭৫ শতাংশ ছাড়, পঞ্চম থেকে সপ্তম বছরে ৫০ শতাংশ ছাড় এবং অষ্টম থেকে দশম বছরে ২৫ শতাংশ ছাড় পাওয়া যেত।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)-এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ""অর্থনীতিতে গতি আনতে হলে বিনিয়োগ প্রয়োজন। সরকার যদি কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম এমন খাতকে ট্যাক্স সুবিধা দেয়, তা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।"

তবে তিনি মনে করেন, যে সুবিধাই দেওয়া হোক তা যেন দীর্ঘমেয়াদি এবং পূর্বানুমানযোগ্য হয়।

আয়কর বিশেষজ্ঞ এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশিষ বড়ুয়া বলেন, "অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন খাতগুলোকে তাদের পারফরম্যান্স বা কর্মক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে প্রণোদনা দেওয়াটা বেশি যৌক্তিক হবে।"

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন অর্থনীতিবিদ উল্লেখ করেন যে, গত বছর হঠাৎ করে এই সুবিধা বাতিল করার পর এখন আবার হঠাৎ তা পুনর্বহাল করা হলে— তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করবে না। তিনি বলেন, "কোনো খাতকে বাদ দেওয়া বা সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত কঠোর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া উচিত—যার ঘাটতি আছে আমাদের দেশে।"

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়