শিরোনাম
◈ ন‌ভেম্ব‌রে ঢাকায় পুরুষ‌দের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল, থাক‌বে‌ ভিআরএস প্রযু‌ক্তি  ◈ হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন ইসরায়েলি শীর্ষ কর্মকর্তা ◈ ৬ নবজাতকের মৃত্যুর দায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ◈ নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফে অসন্তোষ, বিইআরসিকে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ মন্ত্রণালয়ের ◈ ‘আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’, মায়ের মৃত্যু নিয়ে প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন নিহতের ছোট ছেলে বুয়েট অধ্যাপক ◈ কুমির সরিয়ে নেওয়া ঠিক হয়নি, মাজারের দিঘিতে ফেরত চাইলেন খাদেম ◈ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ বিশ্বকাপ মোবাইলে খেলা দেখবেন যেভাবে ◈ ইরান অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা, আর ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র: রুবিও ◈ স্বামী-সন্তান কানাডা প্রবাসী, সেই মিরপুরেই মিলল আরেক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ ◈ গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফের ১০টি পুশইন অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি

প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১২:১৯ দুপুর
আপডেট : ২৭ মে, ২০২৬, ০১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

জলবায়ু সংকটে অস্তিত্বের সীমানায় দক্ষিণ এশিয়া—অসহযোগ নয়, বাঁচাতে হলে এখনই আঞ্চলিক ঐক্য ও যৌথ অভিযোজন জরুরি

ডনের নিবন্ধ: দক্ষিণ এশিয়া আজ জলবায়ু সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে। এক কথায় নিজেরই অস্তিত্ব বিনাশের প্রান্তে। প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের আবাস এই অঞ্চলটি একদিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অন্যদিকে পরিবেশগত ভঙ্গুরতার মাঝখানে আটকে আছে। এখানে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা বৃদ্ধি কোনো ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি ইতিমধ্যেই লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলছে। ‘থার্ড পোল’ অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত গলছে, যা পাকিস্তান ও ভারতের পানিনিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে। আফগানিস্তানে বারবার খরার কারণে মানুষ স্থানান্তরে বাধ্য হচ্ছে, দারিদ্র্য আরও গভীর হচ্ছে। নেপালে হিমবাহ হ্রদ ‘বিস্ফোরণে’র ঝুঁকি পাহাড়ি জনপদগুলোর অস্তিত্বকে বিপন্ন করছে। আর বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকায় দেশের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক শক্তি ব্যয় হয়েছে সীমান্ত বিরোধ, আইডেনটিটির রাজনীতি ও ঐতিহাসিক ক্ষোভে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন যদি আমাদের ভূমিকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলে এবং অর্থনীতিকে অচল করে দেয়, তাহলে এই সব বিরোধের আর কোনো অর্থ থাকবে না। বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় স্পষ্ট যে, ঘৃণা ও বৈরিতার আরেকটি শতাব্দী এই অঞ্চল বহন করতে পারবে না। এখানকার মানুষ নদী, মৌসুমি বৃষ্টি, পাহাড় ও বদ্বীপ ভাগাভাগি করে নেয়- আর এই সব প্রাকৃতিক ব্যবস্থা আজ ভয়াবহভাবে আক্রমণের মুখে। সীমান্ত সংঘাতের চেয়েও এই হুমকি অনেক বেশি বিপজ্জনক।


এই অঞ্চলের হিমবাহগুলো সরে যেতে থাকায় আন্তঃদেশীয় নদী- সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র- ক্রমশ অনিশ্চিত আচরণ করছে। ফলে পানি আর শুধু সম্পদ নয়, বরং সম্ভাব্য সংঘাতের রেখায় পরিণত হচ্ছে। পানির প্রবাহ যত অনিয়মিত হচ্ছে, বাঁধ ও পানি প্রত্যাহারকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতাও তত বাড়ছে। পাকিস্তান-আফগানিস্তানের কাবুল নদী নিয়ে উত্তেজনা, কিংবা সিন্ধুর উপনদীতে ভারতের উজানে বাঁধ নির্মাণ- সবই দেখিয়ে দেয় যে জলবায়ু সম্পর্কিত সম্পদ কত সহজে ভূরাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। কিন্তু এখানেই রয়েছে এক গভীর বৈপরীত্য: কোনো দেশ একা তার পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। এই অঞ্চলের পানিব্যবস্থার বাস্তবতা এমন যে, প্রত্যেক দেশই কোথাও উজান, কোথাও ভাটির দেশ- ফলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য যৌথ সমাধান অপরিহার্য।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই শতকের মাঝামাঝি নাগাদ দক্ষিণ এশিয়া তার জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ হারাতে পারে। কৃষি এই অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস। কিন্তু সেই কৃষিই তীব্র তাপ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতে বিপর্যস্ত। লাহোর, দিল্লি ও ঢাকার মতো শহরগুলো ধোঁয়াশা ও পানির সংকটে হাঁসফাঁস করছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে বাহকবাহিত রোগ ও তাপজনিত অসুস্থতার চাপে। এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারী, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক ও নগর দরিদ্রদের ওপর। তাদের জন্য অভিযোজন কোনো নীতিগত বিতর্ক নয়- এটি প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই।

বাস্তব সত্য হলো, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রকৃত হুমকি সীমান্তের ওপার থেকে আসে না। এটি নিহিত আছে আমাদের আকাশে, নদীতে ও সেই থার্ড পোলে, যা গোটা ভূখণ্ডকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে। জলবায়ু নিয়ে বহুপাক্ষিক আলোচনা অত্যন্ত ধীরগতির এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ। এখন সময় এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার নিজেদের দিকে তাকানোর এবং জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা জোরদার করার। ক্ষুধা আর আশার সহাবস্থানে থাকা এই অঞ্চলে শান্তি কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়, এটি টিকে থাকার কৌশল।

জলবায়ু পরিবর্তন ও সংঘাতমুখী রাজনীতির সংমিশ্রণ এই জনবহুল অঞ্চলকে দ্রুত বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক উত্তেজনাকেন্দ্রে পরিণত করছে। বর্তমান অবস্থা আর টেকসই নয়, কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ক্ষমতার সমীকরণই বদলে দিয়েছে। এই অস্তিত্বগত হুমকি পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও মারাত্মক। এটি লাখো মানুষকে হত্যা করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনা ধ্বংস করে দিতে পারে। এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক ভাষ্য নতুন করে সাজানোর এবং প্রকৃতির চোখ দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর। এতদিন পাকিস্তান ও ভারত শূন্য-সম খেলার ওপর নিজেদের বয়ান দাঁড় করিয়েছে, যেখানে বিরোধই ছিল মূল লক্ষ্যবস্তু। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, মানুষের টিকে থাকা ও কল্যাণকে কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য বানিয়ে, বিরোধকে বাধা হিসেবে দেখতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং বণ্টনমূলক নয় বরং সমন্বয়মূলক আলোচনার কৌশল দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে- প্রতিটি দেশের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।

প্রকৃত অর্থে ‘এশিয়ার দিকে ঝোঁক’ তখনই সম্ভব, যখন দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশ জলবায়ু সংকটকে একটি রাজনৈতিক অপরিহার্যতা হিসেবে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে সম্মত হবে। আঞ্চলিক পদ্ধতির বহু সুবিধা রয়েছে- যা আবেগ নয়, বাস্তববাদ দিয়ে ভাবলে আলোচনায় আনা সম্ভব। এই সংযুক্ত ভূগোলগুলো সবুজ করিডোর হিসেবে কাজ করতে পারে। জলবায়ু সংকট দক্ষিণ এশিয়াকে নিজস্ব একটি ‘আঞ্চলিক জলবায়ু কাঠামো চুক্তি’ গড়ে তুলতে বাধ্য করছে। বর্তমান উত্তেজনা সত্ত্বেও যুক্তিবোধের জায়গা এখনও আছে- জলবায়ু সহযোগিতাকে গৌণ পরিবেশগত ইস্যু নয়, বরং মূল নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে পুনর্গঠনের প্রয়োজন রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার সামনে দুটি সমান্তরাল ভবিষ্যৎ। একটিতে বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকবে- দারিদ্র্য বাড়বে, সংঘাত তীব্র হবে, ঝুঁকি বহুগুণে বাড়বে। অন্যটি শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। আমাদের সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তরুণদের যেন একটি ভয়াবহ ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার হিসেবে না পেতে হয়। তাদেরই নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে- এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে তারা থাকতে চায়।

এই অবস্থান পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সাহস- গেঁড়ে বসা জাতীয়তাবাদী বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস; এবং প্রয়োজন স্পষ্টতা। এই সত্য বোঝার যে টিকে থাকা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয়, যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব। একটি যৌথ দিগন্ত কোনো কল্পনাবিলাস নয়- এটি কৌশলগত অপরিহার্যতা। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হবে না; বরং সংঘাতের মূল্য গুনতে হবে ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি ও হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যতের মাধ্যমে।

(লেখক সিভিল সোসাইটি কোয়ালিশন ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর প্রধান নির্বাহী। দ্য ডন থেকে অনুবাদ করেছেন মানবজমিন)

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়