ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট: বাংলাদেশে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেয়ায় দিল্লির উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন ও দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত সহকারী হাইকমিশনগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের দুশ্চিন্তা আরও গভীর। কারণ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশের নির্বাচন ভারতের স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। সর্বশেষ সহিংসতার সূত্রপাত হয় ১২ই ডিসেম্বর ৩২ বছর বয়সী শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনায়। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। হাদি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ বা ‘প্ল্যাটফর্ম ফর রেভ্যুলুশন’-এর মুখপাত্র ছিলেন।
১২ই ডিসেম্বর শুক্রবার ঢাকায় আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের প্রচার শুরু করার সময় মোটরসাইকেলে আসা মুখোশধারী হামলাকারীরা তাকে মাথায় গুলি করে। তিনি ১৮ই ডিসেম্বর মারা যান। বাংলাদেশ পুলিশ দাবি করেছে, তারা হাদির দুই হামলাকারীকে শনাক্ত করেছে এবং তারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে হাদির সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। দিল্লির কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিস্থিতিই হয়তো তাদের জন্য বাংলাদেশে ভারতীয় মিশনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর একপ্রকার ‘ছাড়পত্র’ দিয়েছে। ঢাকার হাইকমিশনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটে ভারতের চারটি সহকারী হাইকমিশন রয়েছে। বিক্ষোভের জেরে একদিনের জন্য বাংলাদেশিদের ভিসা আবেদন কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়।
ভারত সরকার দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এবং ঢাকাকে তাদের কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়। এদিকে ঢাকায় দু’টি প্রভাবশালী গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর নজিরবিহীন হামলার ঘটনাও দিল্লির নজরে এসেছে। প্রতিষ্ঠান দু’টি হলো- দেশের সবচেয়ে বৃহৎ ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার এবং তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান, সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিক প্রথম আলো। শেখ হাসিনার সমালোচকরা এই দু’টি পত্রিকাকে তার ‘সহযোগী’ ও ‘ভারতপন্থি’ বলে অভিযুক্ত করেন। তবে বাস্তবতা হলো, কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এই দুই সংবাদমাধ্যমই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল। এমনকি হাসিনার কার্যালয় তাদেরকে প্রেস ব্রিফিংয়েও কালো তালিকাভুক্ত করেছিল।
গত বছর ছাত্রদের নেতৃত্বে পরিচালিত শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনকে এই দুই সংবাদমাধ্যমই ‘নতুন ভোর’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল। শুক্রবার ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয়তে এই হামলাকে ‘স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য একটি অন্ধকার দিন’- হিসেবে অভিহিত করা হয়। স্পষ্টতই, ঢাকার ক্ষুব্ধ রাজপথ এখন অদৃশ্য শত্রুদের নিশানা করছে, এমন এক সময়ে যখন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে।
দিল্লির মূল উদ্বেগ আরও গভীরে: এই পরিস্থিতি কি এমন আইনশৃঙ্খলার অবনতির দিকে যাবে, যার ফলে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে? এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। হাদির হত্যাকাণ্ড ঘটে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার ঠিক একদিন পর। অন্তর্বর্তী সরকার সংসদের কোনো তদারকি বা অনুমোদন ছাড়াই ১৬ মাস ধরে প্রশাসনিক নির্দেশে দেশ চালানোর পর এই তফসিল ঘোষণা করে। দিল্লি ও আন্তর্জাতিক মহলের বড় অংশের কাছে বাংলাদেশের নির্বাচন বিশেষ নজরে রয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ভারত সরকার ধারাবাহিকভাবে- বিশেষ করে ১৪ই ডিসেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে- বাংলাদেশে ‘শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মুক্ত, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য’ নির্বাচন চাওয়ার কথা বলেছে। এখানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ শব্দটির অর্থ মূলত আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বোঝানো হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাংলাদেশ সরকার তাদের বক্তব্যে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ শব্দটি ব্যবহার করেনি। তারা বলেছে, তারা ‘সর্বোচ্চ মানের’ নির্বাচন করতে চায় এবং এমন পরিবেশ তৈরি করতে চায়, যেখানে মানুষ ভোট দিতে উৎসাহিত হবে- যা গত ১৫ বছর ধরে কার্যত অনুপস্থিত ছিল।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ভারতের সর্বশেষ বিবৃতিতে আমাদের জন্য পরামর্শ ছিল। আমার মনে হয়, এর কোনো প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশে কীভাবে নির্বাচন হবে সে বিষয়ে আমরা প্রতিবেশীদের পরামর্শ চাই না।
ডেইলি স্টারও বৃহস্পতিবার হামলার আগেই লিখেছিল- ‘তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে দেশ এখন এক উত্তেজনাপূর্ণ কিন্তু সংবেদনশীল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। শান্তিপূর্ণ প্রচার নিশ্চিত করা, সব প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীদের সমান সুযোগ দেয়া এবং নাগরিকরা যেন ভয়মুক্তভাবে তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে- এগুলো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য।’
শুক্রবার বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বানচালের জন্য ‘পরিকল্পিত প্রচেষ্টা’ বলে অভিহিত করেন।
দিল্লির কাছে এসব ঘটনা ৫ই আগস্টের ঢাকার পরিস্থিতি ও তার পরবর্তী অস্থিরতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। পাশের দেশের অস্থিতিশীলতা ভারতের জন্য শুভ নয়- তার ওপর বাংলাদেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ১৪ই ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে, ‘আমরা আশা করি, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে, বিশেষ করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য।’
নয়া দিল্লি বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ আগামী এপ্রিল-মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হওয়ার কথা। একজন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কর্মকর্তা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, আমরা চাই না সহিংসতা বা এই পরিস্থিতির প্রভাব আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এসে পড়ুক। অনুবাদ: মানবজমিন