শিরোনাম
◈ গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফের ১০টি পুশইন অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি ◈ অবশেষে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ◈ তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ, দিনাজপুরে সর্বোচ্চ ৩৮.৫° সেলসিয়াস, আজও ঝড়-বৃষ্টির আভাস ◈ মার্কিন অবরোধের প্রভাব: ভিসা-মাস্টারকার্ড লেনদেন স্থগিতের ঘোষণা কিউবার ◈ মেডিকেলের ছাত্রীরা বছরের পর বছর যৌন হয়রানির শিকার, কমপক্ষে ৩০ জনের অভিযোগ ◈ দ‌ক্ষিণ আ‌ফ্রিকার টি-টোয়েন্টিতে খেল‌বেন রিশাদ হো‌সেন! ◈ ১৩ বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মা‌টি‌তে ওয়ান‌ডে জ‌য়ের স্বাদ পে‌লো  শ্রীলঙ্কা ◈ নতুন-পুরনো সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা: এনআইডি ব্লকের প্রস্তুতি, নতুন তালিকা হচ্ছে, নজরদারিতে স্বজনরাও ◈ বিদ্যুৎ দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে আজ সারা দেশে জামায়াতের বিক্ষোভ ◈ বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ড সফ‌রে যাচ্ছে

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৫৫ দুপুর
আপডেট : ২৬ মে, ২০২৬, ০৯:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

তদন্ত চলাকালে সিঙ্গাপুরীয় শিল্পপতির ব্যাংক হিসাব স্থগিত করল বাংলাদেশ, অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি ব্যবসায়ীর

ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি বিলিয়নিয়ার মুহাম্মদ আজিজ খানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে কর্তৃপক্ষ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে জন্ম নেয়া মুহাম্মদ আজিজ খান, তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং জমিজমা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে অর্থ পাচারের অভিযোগে। তবে এই অভিযোগ তিনি দ্য স্ট্রেইটস টাইমকে দেয়া মন্তব্যে অস্বীকার করেছেন।

আজিজ খান জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, জয়েন্ট স্টক কোম্পানির রেজিস্ট্রার এবং আয়কর কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তিনি বলেন, আমাদের লোকজন বাংলাদেশের সরকারের যেকোনো তদন্তে সহযোগিতা করছে, যেমনটি আমাদের করা উচিত।

আমরা তাদের তদন্তে সম্পূর্ণভাবে সহযোগিতা করছি। কারণ আমরা জানি শেষ পর্যন্ত আমরা নির্দোষ প্রমাণিত হবো। তিনি আরও জানান, এ পর্যন্ত তার বা তার কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আমার বা আমার কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। এ খবর দিয়েছে সিঙ্গাপুরের অনলাইন দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।

আজিজ খানের ভাই ফারুক খান আওয়ামী লীগের সময়ে বাংলাদেশে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী ছিলেন। ২০২৪ সালে এক রাজনৈতিক কর্মী হত্যার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে আছেন তিনি। আজিজ খান ২০২৫ সালের ফোরবস ম্যাগাজিনের তালিকায় সিঙ্গাপুরের ৪৯তম ধনী ব্যক্তি হিসেবে স্থান পান। সে অনুযায়ী, তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৭০ বছর বয়সী আজিজ খান হলেন সামিট পাওয়ারের চেয়ারম্যান। এই গ্রুপ বিদ্যুৎ, বন্দর, ফাইবার অপটিকস এবং রিয়েল এস্টেট খাতে ব্যবসা পরিচালনা করে। এর সবই বাংলাদেশে।

তার প্রধান প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল ২০১৬ সালে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত হয়। বর্তমানে তা ওয়ান র‌্যাফেলস প্লেসে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে ‘দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিচালনাকারী’ হিসেবে বর্ণনা করে। ২০১৯ সালে সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের ২২ শতাংশ শেয়ার ৩৩০ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয় জাপানের জ্বালানি কোম্পানি জেইআরএ কো.। ফলে কোম্পানিটির মূল্যায়ন দাঁড়ায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার।

আজিজ খান ১৯৭০-এর দশকে ১৮ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে যান। তিনি প্রথমে থার্মোপ্লাস্টিকসসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করা একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। পরে নিজস্ব কোম্পানি গড়ে তোলেন। সার ও আখের গুড় রপ্তানি ব্যবসায় যুক্ত হন। পরবর্তীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে মনোনিবেশ করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি বাংলাদেশে প্রথম স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেন। বর্তমানে সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী হিসেবে ১১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করছে।

তিনি ১৯৮৮ সালে সিঙ্গাপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হন এবং ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে কোনো এক সময়ে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব পান। সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, আজিজ খান ইউনিসেফ ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিলের সদস্য। তিনি ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিনল্যান্ডের সম্মানসূচক কনসাল জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আজিজ খানের সাম্প্রতিক সমস্যার শুরু। ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ফলে আগস্ট ২০২৪-এ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং ভারতে চলে যান। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমনপীড়নের নির্দেশ দেয়ার অভিযোগে অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। পরে দুর্নীতির মামলায়ও তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগস্ট ২০২৪-এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। তবে ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির জয়লাভের পর তিনি দায়িত্ব ছাড়বেন এবং নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

আরেক ধনকুবেরের তদন্ত

আজিজ খান একমাত্র বাংলাদেশে জন্ম নেয়া সিঙ্গাপুরীয় নন, যিনি তদন্তের মুখোমুখি। আরেক বিলিয়নিয়ার সাইফুল আলমের বিরুদ্ধেও তদন্ত করছে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। তিনি এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। এই গ্রুপ খাদ্য, উৎপাদন, জ্বালানি, পরিবহন, রিয়েল এস্টেট ও টেলিযোগাযোগ খাতে ব্যবসা করে। এস আলম ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে আর্থিক অপরাধের মামলা হয়েছে।

ঢাকার আদালত তার স্বেচ্ছায় বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আগের সরকারি অনুমোদন স্থগিত করেছে এবং ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির অনুরোধ জানাতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে। তার মার্কিন আইনজীবীরা বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্রের কাছে আন্তর্জাতিক সালিশি দাবি দাখিল করেছেন। তারা দাবি করেছেন, তাদের মক্কেল ‘অযৌক্তিক সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্তের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন।’

সম্পদ জব্দ ও শ্বেতপত্র

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অর্থপাচার প্রতিরোধ ও পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটি জানায়, সামিট ও এস. আলম গ্রুপসহ ১০টি বড় ব্যবসা গ্রুপ এবং হাসিনার পরিবারের কাছ থেকে মোট ৬৬,১৪৬ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। ড. ইউনূসের কমিশন করা এক শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়, হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে দেশ থেকে পাচার হতে পারে। শ্বেতপত্রে চিহ্নিত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ড. ইউনূস প্রশাসন সামিট গ্রুপের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্প বাতিল করে। তবে সামিট গ্রুপ এক বিবৃতিতে জানায়, তারা বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর উভয় দেশের আইন মেনে চলেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব

২০২৫ সাল থেকে আদালত আজিজ খানের পরিবার সংশ্লিষ্ট আরও নগদ অর্থ ও সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে লুক্সেমবার্গে থাকা প্রায় ৪.১ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের শেয়ার এবং বাংলাদেশে অন্তত ৪১.৭৪ কোটি টাকা ও ৩৮,৮০০ বর্গফুট জমি রয়েছে। আজিজ খান বলেন, তদন্ত তার ব্যবসায় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেনি। তিনি বলেন, প্রতিটি ব্যবসাতেই আমাদের উন্নতি হয়েছে। তবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত রয়েছে। আমরা ডাটা সেন্টার গড়তে চাই।

প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে তা সম্ভব। কিন্তু আমরা তা এগিয়ে নিতে পারছি না। আমার মতে, এটিই আমাদের ব্যবসা ও বাংলাদেশের ডাটা দারিদ্র্য দূর করার পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে আমরা দেশের বিদ্যুৎ দারিদ্র্য দূর করেছি। বর্তমান পরিস্থিতি প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে তার আইনি জটিলতা নিয়ে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পারস্পরিক আইনি সহায়তা আইনের অধীনে সিঙ্গাপুর বিদেশি কর্তৃপক্ষকে সম্পদ সংক্রান্ত তথ্য আদান প্রদান ও বাজেয়াপ্ত আদেশ কার্যকরে সহায়তা করতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করে। অনুবাদ: মানবজমিন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়