তাইওয়ান প্রণালীর নিকটবর্তী কৌশলগত জলসীমায় নিজেদের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (পিএলএএন) তাদের অন্যতম অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘টাইপ ০৫৫’ গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘আনকিং ’-এর মাধ্যমে প্রথমবার বাস্তবসম্মত বা ‘কমব্যাট-স্টাইল’ লাইভ-ফায়ার মহড়া সম্পন্ন করেছে। গত ১ এপ্রিল চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ফুটেজে এই শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজটিকে প্রতিকূল ইলেকট্রনিক পরিবেশে লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে দেখা গেছে।
চীনা নৌবাহিনীর ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের অধীনে পরিচালিত এই মহড়াটি মূলত আধুনিক নৌ-যুদ্ধের প্রধান দিকগুলোর ওপর আলোকপাত করেছে। এতে রাডার ও সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমে শত্রুর অবস্থান শনাক্তকরণ, প্রতিকূল তড়িৎ-চৌম্বকীয় পরিবেশে যোগাযোগ রক্ষা এবং অগ্নি-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঠিকতা যাচাইয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়।
মহড়া চলাকালীন এক বিশেষ ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, শুরুতে লক্ষ্যভেদে কিছুটা বিচ্যুতি ঘটলেও আনকিং-এর ক্রু সদস্যরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তা সংশোধন করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম হন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ মহড়া নয়; বরং বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রু সদস্যদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং হার্ডওয়্যারের সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি পরীক্ষা।
‘টাইপ ০৫৫’ আনকিং-এর প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব
১৮০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ২০ মিটার প্রস্থের এই বিশালাকার যুদ্ধজাহাজটি পূর্ণ লোড অবস্থায় প্রায় ১২,০০০ থেকে ১৩,০০০ টন ওজনের পানি স্থানচ্যুত করতে পারে। এর আকার এবং কমান্ড সক্ষমতার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটিকে সাধারণ ডেস্ট্রয়ারের পরিবর্তে 'ক্রুজার' বা রণতরী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে থাকে।
জাহাজটিতে ১১২টি ইউনিভার্সাল ভার্টিক্যাল লঞ্চ সেল (ভিএলএস) রয়েছে। এর মাধ্যমে এটি দূরপাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র (এইচএইচকিউ-৯বি), জাহাজ বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র (ওয়াইজে-১৮) এবং ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র (সিজে-১০) ছুড়তে পারে। এমনকি এটি হাইপারসনিক মিসাইল বহনেও সক্ষম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাহাজটির সম্মুখভাগে রয়েছে ১৩০ মিমি মেইন গান, এছাড়া ১১-ব্যারেলের ৩০ মিমি ক্লোজ-ইন ওয়েপন সিস্টেম এবং ২৪-সেলের পয়েন্ট-ডিফেন্স লঞ্চার। এতে রয়েছে ‘টাইপ ৩৪৬বি’ অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার এবং উন্নত সোনার সিস্টেম, যা আকাশ, পানি এবং পানির তলদেশে শত্রুকে শনাক্ত করতে সক্ষম।
কৌশলগত গুরুত্ব ও তাইওয়ান পরিস্থিতি
বর্তমানে চীনের কাছে মোট ১০টি ‘টাইপ ০৫৫’ ডেস্ট্রয়ার রয়েছে। এর মধ্যে নতুন কমিশনপ্রাপ্ত ‘আনকিং (১১০)’ এবং ‘ডংগুয়ান (১০৯)’-কে ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডে মোতায়েন করা হয়েছে। তাইওয়ান ঘিরে যেকোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে এই কমান্ডটিই প্রধান ভূমিকা পালন করবে।
আনকিং-এর মতো যুদ্ধজাহাজগুলো মূলত নৌ-বহরের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এটি বিমানবাহী রণতরী বা উভচর ল্যান্ডিং গ্রুপকে দূরপাল্লার সুরক্ষা প্রদান করে এবং শত্রুর স্যাচুরেশন অ্যাটাক (একসাথে অনেক হামলা) মোকাবিলায় সমন্বয়কারী হিসেবে ভূমিকা রাখে।
১৯৭০-এর দশকে যে বড় ডেস্ট্রয়ারের স্বপ্ন চীন দেখেছিল, কয়েক দশকের আধুনিকায়ন শেষে ‘আনকিং’-এর মাধ্যমে তা আজ পূর্ণতা পাচ্ছে। এই লাইভ-ফায়ার মহড়া প্রমাণ করে যে, চীন এখন কেবল সংখ্যাগতভাবে নয়, বরং কারিগরি ও রণকৌশলগতভাবেও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী নৌ-বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। আনকিং-এর এই সফল প্রশিক্ষণ চক্র চীনকে সমুদ্রসীমায় আরও আগ্রাসী এবং আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আর্মি রিকগনিশন