মহসিন কবির: ইরানে আক্রমণের পর একাই দুটি বড় রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন তেহরান। একরে পর এক আক্রমণ পরিচালনা করছে। এজন্য অনেককে জীবন দিতে হয়েছে, তবুও পিছু হঠছে না। দু-একটি দেশ পাশে থাকার কথা বললেও সেই কাগজ-কলমেই। মাঠের যুদ্ধে অস্ত্র কিংবা অন্যকিছু দিয়ে সহায়তা করছে না। শুধু বলছে পাশে আছি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারো ইরানকে হুমকি দিয়ে আলটিমেটামের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আগামী সোমবার (৬ এপ্রিল) এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানকে কঠোর মূল্য দিতে হবে। খবর বিবিসির।
ইরানে মার্কিন–ইসরাইলি হামলা শুরুর পর থেকে তিনি একাধিকবার আলটিমেটাম দিয়েছেন। সর্বশেষ আজ তিনি সেই সতর্কতার বিষয়টি পুনরায় তুলে ধরেন।
ইসরায়েল ও কুয়েতে স্থানীয় সময় রোববার ভোরে ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এ হামলার এক দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন। অন্যথায় দেশটির ওপর চরম বিপর্যয় নেমে আসবে বলে হুঁশিয়ার করেন তিনি। কুয়েত ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের সর্বশেষ হামলার জবাব দিচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। চলমান এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির অনেক শীর্ষস্থানীয় বেসামরিক–সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানও পাল্টা জবাব দিচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ এমনিতেই অপ্রিয় হয়ে উঠেছে মার্কিন নাগরিকদের কাছে, এবার তা এক নতুন ও সংকটাপন্ন ধাপে প্রবেশ করল। ইরানের আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার খবরটিই জটিল এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ঘটনাটি সম্পর্কে এখনো অনেক তথ্য অজানা, বিশেষ করে এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের দুই বৈমানিকের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা স্পষ্ট নয়। তাঁদের একজনকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে খবর মিলেছে, তবে অন্যজনের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এরই মধ্যে গত শুক্রবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি যুদ্ধবিমানে আঘাত হানার খবরটি আসে। মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগেই পাইলট সেটিকে ইরানের সীমানার বাইরে আনতে সক্ষম হন এবং পরে নিরাপদে প্যারাসুটের মাধ্যমে নিচে নামলে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
এই দুই ঘটনার মানে এই নয় যে ইরান হঠাৎ করেই সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমান হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত মার্কিন হতাহতের সংখ্যাও সীমিত, এমনকি গত তিন সপ্তাহে কোনো নিহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শক্তিই হলো তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব। এক মাস ধরে ইরানের আকাশে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও অপরাজেয় থাকার যে দাবি ট্রাম্প প্রশাসন করে আসছিল, সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো তাতে বড় ধরনের চিড় ধরিয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে এই দাবি আগে থেকেই বিভিন্ন ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। তবে এবারের ঘটনাটি সেই অসারতাকেই স্পষ্ট করে তুলল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ইরান ও ইসরায়েলের আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ বিচরণ রয়েছে এবং তেহরানের তা ঠেকানোর কোনো সামর্থ্যই নেই।
গত ৪ মার্চ এক ব্রিফিংয়ে হেগসেথ বলেছিলেন, ইরানের আকাশে খুব শিগগির পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তিনি দাবি করেছিলেন, বিশ্বের দুই শক্তিশালী বিমানবাহিনী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের আকাশসীমা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেবে এবং ইরান কিছুই করতে পারবে না। দুই সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প নিজেও ইরানের আকাশে এই কথিত আধিপত্যের কথা বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করে আসছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক যুদ্ধবিমানের মধ্যে মাত্র দুটি ভূপাতিত করার বিষয়টি মার্কিন প্রশাসন এড়ানোর চেষ্টা করলেও তা সহজে এড়াতে পারবে না। কারণ, আকাশপথে সামরিক আধিপত্য নিয়ে প্রশাসনের দাবিগুলো ছিল একেবারেই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের। তারা ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আকাশসীমা’র মতো শব্দ ব্যবহার করেছে, এমনকি ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো কোনো অস্ত্রশস্ত্র নেই বলেও দাবি করেছিল।
সামরিক সাফল্য নিয়ে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বাড়িয়ে বলার এটিই সর্বশেষ উদাহরণ নয়। গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়ে গেছে এবং এটি আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন কোনো তথ্য ছিল না। এর ঠিক ৯ মাস পর প্রশাসন আবারও হঠাৎ করে ইরানকে একটি আসন্ন পারমাণবিক হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে।
মার্কিন জনগণের এই অভিযানের ওপর খুব একটা আস্থা নেই। তাঁদের মতে, যুদ্ধের উদ্দেশ্যগুলো স্পষ্ট করা হয়নি এবং চারটি প্রধান লক্ষ্যের তালিকাও বারবার পরিবর্তন করা হয়েছে। সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা। সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা মনে করছেন, এই যুদ্ধের পেছনে যে খরচ হচ্ছে, তা যুক্তিযুক্ত নয়।
এত কিছুর পরও হেগসেথ দাবি করে আসছেন, গণমাধ্যম এই অভিযানের সামরিক সাফল্যগুলোকে ঠিকঠাক প্রচার করছে না। গত ৪ মার্চের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ভুয়া সংবাদমাধ্যমগুলো যা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে তা হলো, কোনো স্থলসেনা পাঠানো ছাড়াই আমরা ইরানের আকাশ ও জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছি।’
এর এক মাস পর দেখা যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এমনকি ইরানের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কর্মসূচি ধ্বংসের যে ঢাকঢোল পেটানো হয়েছিল, বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না।
ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইসরাইলকে কোনো আক্রমণাত্মক অস্ত্র দেবে না সাফ জানিয়ে দিয়েছে ফ্রান্স। রোববার প্রেসটিভির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাথরিন ভোত্রাঁ এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে বলেন, “না, ফ্রান্স ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহ করছে না। তিনি উল্লেখ করেন, ফ্রান্স কিছু উপাদান বিক্রির অনুমতি দিয়েছে, যা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়। যেমন, আয়রন ডোমে ব্যবহারের জন্য প্রজেক্টাইল। সে সঙ্গে কিছু সরঞ্জাম রয়েছে যার একটি অংশ ফরাসি সশস্ত্র বাহিনীর প্রয়োজনেও ব্যবহৃত হয়।
ইরান জানিয়েছে, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না দেশটি। রোববার আলজাজিরার প্রতিবেদনে ইরানের প্রেসিডেন্ট দপ্তরের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়।
দেশটির প্রেসিডেন্ট দপ্তরের যোগাযোগ বিষয়ক উপদেষ্টা সাইয়্যেদ মেহদি তাবাতাবায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, নতুন একটি আইনি কাঠামো অনুযায়ী ট্রানজিট ফি’র মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হলে তবেই প্রণালিটি খুলে দেওয়া হবে।
ইসরাইলের তেল আবিবে যুদ্ধবিরোধী এক বিক্ষোভে অভিযান চালিয়েছে ইসরাইলের পুলিশ। বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান চালিয়ে ইহুদি-আরব আন্দোলনের নেতা অ্যালন-লি গ্রিনসহ একাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। খবর মিডল ইস্ট আইয়ের।
অ্যালন-লি গ্রিন ‘স্ট্যান্ডিং টুগেদার’ নামের একটি ইহুদি-আরব আন্দোলনের নেতা। তিনি ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ, প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা এবং গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এই বিক্ষোভে অংশ নেন।
নিখোঁজ মার্কিন পাইলটকে উদ্ধারে আমেরিকার একটি বিশেষ অভিযানকে ব্যর্থ দাবি করেছে ইরান।
এর আগে সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ট্রাম্পের ওই দাবির পরই ওই অভিযানকে ব্যর্থ দাবি করে ইরান সরকার ও দেশটির গণমাধ্যম। দেশটির কেন্দ্রীয় সামরিক সদর দপ্তর খাতামুল আম্বিয়া মুখপাত্র এক বিবৃতিতে অভিযানকে ব্যর্থ দাবি করেন।
মার্কিন-ইসরাইলি হামলার পর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস। খবর আলজাজিরার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় টেড্রোস বলেন, ‘এই হামলা একটি কঠিন সতর্কবার্তা—এ ধরনের আঘাত পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যার স্বাস্থ্যগত প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ধ্বংস করতে পারে। সংঘাত যত বাড়ছে, ঝুঁকি ও হুমকিও ততই বাড়ছে।’