কাস্পিয়ান সাগর থেকে পারস্য উপসাগর—পুরো অঞ্চলের জ্বালানি রুট পুনর্নির্ধারণের এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে তুরস্ক। কাতার, সৌদি আরব এবং তুর্কমেনিস্তানের জ্বালানি সম্পদকে নিজেদের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তুরস্ক এখন একটি বিশ্বস্ত ‘এনার্জি হাব’ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী যখন অনিশ্চয়তার মুখে, তখন তুরস্কের এই প্রস্তাবগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গত এক মাস ধরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ তেল ও গ্যাস সরবরাহকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে তুরস্কের জ্বালানি মন্ত্রী আলপারসলান বায়রাক্টার বেশ কিছু নতুন ও পুরনো প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তুরস্কের মূল লক্ষ্য হলো—একটি বিকল্প রুট তৈরি করা যা মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসকে সরাসরি ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলোতে পৌঁছে দেবে।
কাতার-তুরস্ক গ্যাস পাইপলাইন: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবটি হলো কাতার থেকে তুরস্ক পর্যন্ত একটি বিশাল গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ। এটি সৌদি আরব, জর্ডান এবং সিরিয়ার ওপর দিয়ে পার হবে।
সম্প্রতি ইরান কর্তৃক অবকাঠামো আক্রান্ত হওয়ার পর কাতার তাদের এলএনজি সরবরাহে ‘ফোর্স মেজার’ (অনিবার্য কারণে সরবরাহ ব্যাহত) ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন নির্মাণে খরচ হতে পারে ১৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। কাতার এতদিন পাইপলাইনের চেয়ে এলএনজি কার্গোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে কারণ এতে বিক্রয় ও গন্তব্যে নমনীয়তা থাকে। তবে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর এই পরিকল্পনায় নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
তুরস্কের অপর একটি বড় লক্ষ্য হলো ‘ট্রান্স-কাস্পিয়ান গ্যাস পাইপলাইন’। এর মাধ্যমে তুর্কমেনিস্তানের বিপুল গ্যাস ভাণ্ডারকে কাস্পিয়ান সাগরের তলদেশ দিয়ে আজারবাইজান এবং সেখান থেকে তুরস্ক হয়ে ইউরোপে পাঠানো হবে।
তুর্কমেনিস্তান বছরে ৮০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস রপ্তানি করতে সক্ষম। বর্তমানে তারা ইরানের সাথে ‘সোয়াপ’ চুক্তির মাধ্যমে কিছু গ্যাস সরবরাহ করে।
কাস্পিয়ান সাগরের নিচে ৩০০ কিলোমিটার পাইপলাইন তৈরিতে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে। এছাড়া রাশিয়া ও ইরানের বিরোধিতার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তুরস্ক চাইছে ইরাকের বসরা থেকে উত্তরের কির্কুক পর্যন্ত বিদ্যমান পাইপলাইনের সক্ষমতা বাড়িয়ে তা তুরস্কের সেয়হান বন্দরের সাথে পুরোপুরি যুক্ত করতে।হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় ইরাকের তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটিকে সরকারি বেতন ও খরচ মেটাতে মাসে অন্তত ৬.৩ বিলিয়ন ডলার আয় করতে হয়, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ইরাকের নীতিনির্ধারকরা এখন তুরস্কের রুটের দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
সিরিয়ার তেলক্ষেত্রগুলোকে তুরস্ক-ইরাক পাইপলাইনের সাথে যুক্ত করার একটি প্রস্তাবও আলোচনায় আছে। এতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হলেও এটি কাতার প্রকল্পের চেয়ে সহজসাধ্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তুরস্কের এই বিশাল পরিকল্পনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরাসরি ভূমধ্যসাগরীয় রুটে জ্বালানি পাঠাতে পারবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ঐক্য।
তুরস্কের জ্বালানি মন্ত্রী বায়রাক্টারের মতে, "আশা করি এই সংকট সবাইকে থামতে এবং গুরুত্ব সহকারে ভাবতে বাধ্য করবে, যাতে আমরা এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে পারি।" সূত্রঃ এমইই