পাকিস্তানের টালমাটাল অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে এল রিয়াদের আর্থিক সহায়তা। পাকিস্তান স্টেট ব্যাংক (এসবিপি) মঙ্গলবার নিশ্চিত করেছে, সৌদি আরব থেকে ১০০ কোটি ডলার পেয়েছে দেশটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক বিবৃতিতে জানায়, ২০ এপ্রিল সৌদি আরবের অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ১০০ কোটি ডলার পেয়েছে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান (এসবিপি)। এটি সম্প্রতি সম্মত হওয়া ৩০০ কোটি ডলারের আমানতের দ্বিতীয় কিস্তি। এর আগে গত সপ্তাহে প্রথম কিস্তি হিসেবে ২০০ কোটি ডলার স্থানান্তর করা হয়।
এই অর্থপ্রাপ্তি ঘটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সৌদি আরব সফরের পর। সফরে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের চেষ্টা করেন। শুক্রবার সৌদি আরব পাকিস্তানের জন্য অতিরিক্ত ৩০০ কোটি ডলার আমানত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান ৫০০ কোটি ডলারের সুবিধার মেয়াদ আরও তিন বছরের জন্য বাড়ায়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।
তবে এই সহায়তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ রয়ে গেছে। এ মাসেই দেশটিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ৩৫০ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এই অর্থ পরিশোধ করলে রিজার্ভ কমিয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২৭ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৬৪০ কোটি ডলার, যা প্রায় তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
তবে আমিরাতকে ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এই সুরক্ষায় নতুন চাপ তৈরি করেছে। মার্চ মাসে ইসলামাবাদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ৩৫০ কোটি ডলারের ঋণ নবায়ন (রোলওভার) করতে ব্যর্থ হয়। গত সাত বছরে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটেছে, যা স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব এ সহায়তার জন্য সৌদি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া সৌদি আরব তাদের আগের প্রদান করা ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের মেয়াদও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ইসলামাবাদের জন্য বড় এক কূটনৈতিক বিজয়।
বর্তমানে পাকিস্তানের বৈদেশিক খাত একটি সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক তেলের দাম বৃদ্ধি এবং এর প্রভাব অর্থনীতির ওপর পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যিক অর্থায়নের ঝুঁকি এখনো বড় দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে যখন জ্বালানির দাম অস্থির এবং বৈশ্বিক মূলধন বাজার সীমিত।
পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন তলানিতে, তখন এই অর্থ প্রাপ্তি দেশটিকে সম্ভাব্য দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এটি মূলত বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের ঘাটতি মেটানো, আন্তর্জাতিক বাজারে পাকিস্তানের ক্রেডিট রেটিং বা বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা, প্রয়োজনীয় আমদানির বিপরীতে অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করা — এই তিনটি কাজে সহায়তা করবে।
সৌদি আরবের সহায়তায় দম ফেলার সুযোগ পেলেও পাকিস্তানের সামনে এখন পাহাড়সম ঋণ পরিশোধের চাপ। চলতি মাসেই সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ফেরত দিতে হবে পাকিস্তানকে। দুবাই এই অর্থ ফেরতের সময়সীমা বাড়াতে (রোল ওভার) রাজি না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। ইতিমধ্যে চলতি মাসেই ১.২ বিলিয়ন ডলারের ইউরোবন্ডের পাওনা মিটিয়েছে পাকিস্তান।
সৌদি আরবের এই সময়োপযোগী সাহায্য পাকিস্তানের অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে এনেছে। তবে ইউএই-র পাওনা পরিশোধের চাপ সামলানোই এখন অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেবের সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।