বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্ক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ও সতর্ক উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি জানিয়েছেন, বর্তমানে স্থবির হয়ে থাকা ৪০টিরও বেশি দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা করছে দিল্লি।
সোমবার (৪ মে) নয়াদিল্লিতে সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেন।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, বাংলাদেশের নতুন নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মের বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বৈঠকে বাংলাদেশি সাংবাদিকরা গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, তিস্তার পানিবণ্টন, শেখ হাসিনার প্রত্যাবাসন, আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও ভিসা সমস্যাসহ নানা প্রসঙ্গ তোলেন।
পানি বণ্টন ইস্যুতে বিক্রম মিশ্রি বলেন, আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। প্রায় তিন দশক আগের এই চুক্তি কার্যকরভাবে কাজ করেছে এবং প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে তা নবায়ন করা হবে। দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে এবং পানি খাতের সহযোগিতা ভারতের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তবে তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি জানান, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার কারণে আটকে আছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের ফলে চুক্তিতে গতি আসবে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মার বিতর্কিত মন্তব্য প্রসঙ্গে বিক্রম মিশ্রি সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ওই মন্তব্যগুলো নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল। তিনি এ ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যকে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সঙ্গে মিলিয়ে বড় করে না দেখার পক্ষপাতী। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানান, পররাষ্ট্র সম্পর্ক নির্ধারণ কেন্দ্রীয় সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত, এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজ্যের রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের রাজনৈতিক পছন্দ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বিক্রম মিশ্রি বলেন, ভারত বাংলাদেশের সব সরকারের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে, যা একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো প্রকল্পগুলো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের উপকারের জন্য করা হয়। বাংলাদেশের নির্বাচনে জড়িত থাকার অভিযোগও তিনি নাকচ করে দেন।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ২০২৪ সালে ঢাকা সফর এবং ২০২৫ সালে ব্যাংককে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যোগাযোগের গতি কিছুটা ধীর ছিল, তবে এখন বাণিজ্য বৃদ্ধি, ভিসা সহজীকরণ এবং সেপা চুক্তির মতো বিষয়ে দুই দেশ আগ্রহী।
বিক্রম মিশ্রির বক্তব্যে স্পষ্ট, ভারত বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে কাঠামোগত ও ধীরস্থির উন্নতির দিকে নজর দিচ্ছে। দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধানই আগামী দিনের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করবে। দেশ রূপান্তর