জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণে মোট ৫৪ সাক্ষীকে আদালতে হাজির করেছে প্রসিকিউশন।
আসামি থেকে অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হিসেবে আবির্ভূত হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের জবানবন্দিও রয়েছে সেখানে।
এছাড়া প্রয়াত লেখক, গবেষক ও মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর গত সেপ্টেম্বরে মারা যাওয়ার আগে একটি লিখিত জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালে জমা দেন।
পাঁচ অভিযোগ সংবলিত মামলার অভিযোগপত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা, জাতীয় দৈনিকের এক সম্পাদকসহ ৮১ জনকে সাক্ষী হিসাবে রেখেছিল প্রসিকিউশন। শেষ পর্যন্ত মোট ৫৪ জনের সাক্ষ্য শুনেছে আদালত।
এসব সাক্ষ্যের পাশাপাশি আন্দোলন দমাতে এবং আন্দোলনে গুলি চালানোর ‘সরাসরি নির্দেশ দেওয়া’ শেখ হাসিনার কিছু কথোপকথনও আদালতে শুনিয়েছে প্রসিকিউশন। এক্ষেত্রে একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সাক্ষ্যও গ্রহণ করা হয়েছে।
আন্দোলনের সময় রংপুরে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের বাবা; খোকন চন্দ্র বর্মণ, আব্দুল্লাহ আল ইমরানসহ আন্দোলনে আহত বেশ কয়েকজন, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা নাহিদ ইসলাম এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ছিলেন সাক্ষীদের মধ্যে।
গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট পাঁচ অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে।
এ মামলায় শেখ হাসিনার সঙ্গে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনও আসামি। তাদের মধ্যে মামুন দায় স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনে যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলিবিদ্ধ খোকন চন্দ্র বর্মণ গত ৩ অগাস্ট নিজের ক্ষতিগ্রস্ত মুখমণ্ডল দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
গুলিতে ২৩ বছর বয়সী যুবক খোকন চন্দ্র বর্মণের বাঁ চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়, নাক ও মুখমণ্ডল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশে চিকিৎসার পর তাকে রাশিয়াতেও পাঠানো হয় চিকিৎসার জন্য।
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির দিন ৫ অগাস্ট যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন খোকন।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পর থানা থেকে পুলিশ বেরিয়ে এসে তাদের ওপর ‘পাখির মত’ গুলি করতে থাকে। তারা যে যেখানে পারেন, আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি ও কয়েকজন যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে পিয়ারের পেছনে লুকান।
খোকন বলেন, একপর্যায়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে তাদের ‘টার্গেট করে’ গুলি করে। সেখানে যারা ছিলেন, বেশিরভাগই গুলিবিদ্ধ হন। একপর্যায়ে তিনি ফ্লাইওভারের নিচে থাকা ড্রামের পেছনে আশ্রয় নেন। সেখানে একজন পুলিশ তাকে দেখে ‘মাথা নিশানা করে’ গুলি করেন। সেই গুলি লাগে তার মুখমণ্ডলে।
গুলি লাগার পর ছটফট করছিলেন জানিয়ে খোকন বলেন, তার আর বাঁচার আশা ছিল না।
এরপর খোকন মাস্ক সরিয়ে ট্রাইব্যুনালে নিজের ক্ষতিগ্রস্ত চেহারা দেখান।
তিনি বলেন, তার চিৎকারে ছাত্ররা এগিয়ে এসে তাকে ধরে ওঠায়। তার পকেট থেকে ফোন বের করে পরিবারকে খবর দেয়। তাকে মুগদা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে অবস্থা খারাপ দেখে তাকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে খোকনকে পাঠানো হয় মিরপুর ডেন্টাল হাসপাতালে। চিকিৎসা নিয়ে নতুন জীবন ফিরে পান এই যুবক।
অভ্যুত্থানে নিহত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসে ভিডিওতে ছেলের মৃত্যুর দৃশ্য দেখে নীরবে কেঁদেছেন তার বৃদ্ধ বাবা মকবুল হোসেন।
২৮ অগাস্ট ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে তিনি বলেছেন, জীবদ্দশাতেই ছেলে হত্যার বিচার দেখতে চান তিনি।
ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্স অ্যান্ড হসপিটালের চিকিৎসক মাহফুজুর রহমান গত ২০ অগাস্ট তার সাক্ষ্যে বলেন, আহতদের চিকিৎসা না দিতে ‘চাপ দেন ডিবি সদস্যরা’।
পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযাগ করে তিনি বলেন, “১৯ জুলাই যখন রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল, তখন ডিবির লোকেরা এসে নতুন গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের ভর্তি না করার জন্য আমাকে চাপ দেয়। বলে–‘আপনি অতি উৎসাহী হবেন না, আপনি বিপদে পড়বেন’।
“তারা আরও বলে– যাদের ভর্তি করেছেন, তাদেরকে রিলিজ করবেন না; এ বিষয়ে উপরের নির্দেশ আছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চিকিৎসক মাহফুজুর সাক্ষ্যে বলেন, “তখন আমরা কৌশলে ভর্তি রেজিস্ট্রারে রোগীদের জখমের ধরন পরিবর্তন করে গুলিবিদ্ধের স্থলে সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কারণ লিপিবদ্ধ করে ভর্তি করি। আহত রোগীদের বয়স ছিল ১৩ থেকে ৩০ এর মধ্যে। তাদের অধিকাংশই ছিল শিক্ষার্থী।”
ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ে সামনে সারি থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিভিন্ন দিক গত ১৭ সেপ্টেম্বর তুলে ধরেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করে তিনি বলেন, “১৪ জুলাই রাতে শেখ হাসিনা একটি সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে রাজাকারের বাচ্চা এবং রাজাকারের নাতিপুতি অভিহিত করে কোটা প্রথার পক্ষে অবস্থান নেন। মূলত এই বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণের একটি বৈধতা প্রদান করা হয়।
“কারণ আমরা সবসময় দেখেছি, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো ন্যায্য আন্দোলন করা হলে তাদেরকে ‘রাজাকার’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলনের ন্যায্যতা নস্যাৎ করা হত। ছাত্রদেরকে রাজাকারের বাচ্চা এবং রাজাকারের নাতিপুতি আখ্যায়িত করায় সমগ্র দেশের ছাত্রছাত্রীরা অপমানিত বোধ করে।”
২০২৪ সালে ১৮ জুলাই সারাদেশের সর্বস্তরের ছাত্রজনতার রাস্তায় নেমে আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ জীবনের হুমকির মুখে পড়ি এবং গ্রেপ্তার এড়াতে আমরা আত্মগোপনে চলে যাই।”
জুলাই আন্দোলন দমাতে পুলিশ ‘৩ লাখ ৫ হাজার গুলি ছোড়ে’ বলে ট্রাইব্যুনালে ২৯ সেপ্টেম্বর তুলে ধরেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর।
আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসে তিনি বলেন, তদন্ত চলাকালে চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি এক স্মারকের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জুলাই আন্দোলন দমনে ছাত্র-জনতার ওপর ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলি সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি পেয়েছেন।
“প্রতিবেদনে দেখা যায়, এলএমজি, এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল, শটগান, রিভলবার ও পিস্তলসহ বিভিন্ন মারণাস্ত্র ব্যবহার করে শুধু ঢাকায় ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড গুলি ব্যবহার করা হয়েছে। সারাদেশে ব্যবহার করা হয়েছে ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলি।”
ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিতে গিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে সময় দমন-পীড়নের ঘটনায় জাতিসংঘের দেওয়া প্রতিবেদনের বরাতে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ১৬ সেপ্টেম্বর বলেন, জুলাই-অগাস্টে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে শেখ হাসিনা হত্যা ও লাশ গুম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশে গণহত্যা চালানো হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের উপর ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটির’ দায় পড়ে।
মাহমুদুর রহমান বলেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ইটালি ও জার্মানিতে ফ্যাসিস্ট শাসক মুসোলিনি ও হিটলারের পতন হয়েছিল যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর। জার্মানিতে সেই সময় জনগণ বিশেষ করে, ইহুদি জনগোষ্ঠীর উপরে যে গণহত্যা চালানো হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে সারাবিশ্বে আওয়াজ উঠেছিল ‘Never Again’, অর্থাৎ আর যেন কখনও হিটলারের মতো নিষ্ঠুর ফ্যাসিস্ট শাসকের আগমন না ঘটে।
“বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার ১৫ বছরের চরম দুর্নীতিপরায়ণ এবং মানবতাবিরোধী শাসনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা হল, আর যেন কখনও আমাদের দেশে এমন ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রত্যাবর্তন না ঘটে।” উৎস: বিডিনিউজ২৪