শিরোনাম
◈ বাড়তি মার্কিন শুল্ক কার্যকর হলে রপ্তানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা ◈ শেখ হাসিনার পক্ষের দাবি নাকচ, জুলাই অভ্যুত্থান প্রতিবেদনের পাশে জাতিসংঘ ◈ কারামুক্ত হলেন সাবেক মেয়র আইভী ◈ দিল্লির আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত ২১; আহতদের মধ্যে ৫ বাংলাদেশি ◈ ‘আসল’ তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ঋতব্রতের হাতে, মমতাকে উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব ◈ অস্ট্রেলিয়ার বিরু‌দ্ধে বাংলা‌দে‌শের ওয়ান‌ডে দল ঘোষণা, মিরাজ অ‌ধিনায়ক ◈ বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ তুলে নিল সরকার ◈ হাজিদের লাগেজ চুরি রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ধর্মমন্ত্রীর ◈ ৩০০ দিনে ১৭ দেশ পেরিয়ে আর্জেন্টিনার ক্যাম্পে ৩ ভক্ত সাইক্লিস্ট  ◈ হাদি ইস্যুতে মমতার মন্তব্য; যা বললেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (ভিডিও)

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ, ২০২৬, ১১:১৯ দুপুর
আপডেট : ২৯ মে, ২০২৬, ০৭:০০ বিকাল

প্রতিবেদক : মহসিন কবির

স্থবিরতা কাটাতে আলোচনায় স্থানীয় নির্বাচন, ইস্যু হতে পারে ‘জুলাই সনদ’

মহসিন কবির: বিগত সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট স্থবিরতা কাটাতে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছে। সরকার বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিলেও, বিরোধী দলগুলো একে নির্বাচনের পূর্বপ্রস্তুতি ও প্রশাসন দখলের চেষ্টা হিসেবে দেখছে। 

২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং আরেক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সব কাউন্সিলরকে অপসারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। পরে আদালতের রায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিএনপি নেতা ডা. শাহাদত হোসেন। 

তাই দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন চালাতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল বিগত সরকার। একইভাবে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার মেয়রদেরও অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এ ছাড়া অনেক ইউনিয়ন পরিষদও হয়ে পড়ে জনপ্রতিনিধিহীন। ফলে প্রায় ১৯ মাস ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়া চলছে প্রায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান।

এ অবস্থায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের মেয়াদ এক মাসের বেশি হয়ে গেলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সময়ক্ষণ নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে ১১টি সিটি এবং জেলা পরিষদগুলোতে দলীয় বিবেচনায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন ফের আলোচনায় এসেছে। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, এটা স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বের ইঙ্গিত।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার যাত্রা শুরুর পর চলতি বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানা যায়। কিন্তু সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন বড় আয়োজনের ব্যাপার হলেও ঠিক কবে শুরু এবং শেষ হবে এর কোনো রোডম্যাপ পাওয়া যায়নি। এক্ষেত্রে বড় বাধা অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা স্থানীয় সরকার বিষয়ক অধ্যাদেশ। এতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেই অধ্যাদেশগুলো এখন নতুন সংসদে আইনে পরিণত না হওয়া বা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের পথে হাঁটার সুযোগ নেই।

জানা গেছে, অধ্যাদেশগুলো বর্তমানে সংসদের বিশেষ অধিকার কমিটিতে বিবেচনাধীন। সেখান থেকে সুপারিশ করে সংসদে উত্থাপন করবে সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটি। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের মাধ্যমে আইনে পরিণত হলে নির্বাচনের পথ খুলবে। অধ্যাদেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে দলীয় প্রতীক তুলে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোতে এটা বড় পরিবর্তন। এগুলো বাস্তবে রূপ দিতে হলে আইনের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কাজ চলছে। নিঃসন্দেহে এ বছরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সম্প্রতি ১১টি সিটি করপোরেশনে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। নিজ দলের নেতাদের এভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব দেওয়ার রেওয়াজ আওয়ামী লীগ শাসনামলেও ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশের সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল অতীতের ধারা থেকে বের হয়ে বিএনপি নতুন রাজনৈতিক ধারা চালু করবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর অপরাপর রাজনৈতিক দল এবং বিশ্লেষকরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে। তাদের কেউ কেউ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন ঝুলে যাওয়ার লক্ষণ দেখছেন।

সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় লোকদের প্রশাসক দিলেও নতুন করে আর প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, বর্তমানে যেসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে এডিসি ও ইউএনওরা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, সেখানে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা হবে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেবেন।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. বদিউল আলম মজুমদার আমাদের সময়কে বলেন, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে বলা আছে— স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত হবে। অনির্বাচিতরা নয়। তা ছাড়া উচ্চ আদালতের একটা রায় আছে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পরিচালিত না করলে এসব প্রতিষ্ঠান থাকার দরকার নেই।

অন্যদিকে বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার ৩১ দফাতেও বলা আছে বিশেষ পরিস্থিতি না হলে অথবা আদালতের আদেশের কারণে বাধা না থাকলে প্রশাসক নিয়োগ করবে না। তাদের সেই অঙ্গীকারের মর্মার্থ বাস্তবে রূপায়িত করতে হলে দ্রুততার সঙ্গে নির্বাচন করা জরুরি। বিএনপির অঙ্গীকার ছিল প্রশাসক নিয়োগের বিপক্ষে। প্রশাসক নিয়োগ কাক্সিক্ষত না। আশা করি, বিএনপি দ্রুততার সঙ্গে নির্বাচন দিয়ে তাদের অঙ্গীকার মানবে।

নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়া শেষে একজন নির্বাচন কমিশনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ঈদুল ফিতরের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর দিকে হাঁটতে চায় ইসি। প্রথমে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন দিয়ে শুরু করার পরিকল্পনা ছিল ইসির। কিন্তু সরকার দুই দফায় ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক বসানোর পর নির্বাচন কমিশনও থমকে গেছে। তারাও জানে না কবে এই নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে।

আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কোনো সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদে হলে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে অবহিত করে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। সেই চিঠির আলোকে নির্বাচনী কর্মপরিকল্পনা সাজায় ইসি। কিন্তু নতুন সরকার এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ইসিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেনি। উল্টো একের পর এক দলীয় লোকদের প্রশাসক পদে বসানো হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভাবনা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গণমাধ্যমকে বলেছেন, এখনও কোনো পরিকল্পনা হয়নি। নতুন সরকার, নতুন সংসদ সবকিছু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত হবে। ঈদের পর অফিস খুললে কমিশন সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কর্মপরিকল্পনা সাজানো হবে। তবে এখনও এ বিষয়ে কোনো আলাপ হয়নি।

প্রশ্ন উঠেছে, শুধু প্রশাসক দিয়ে স্থানীয় সরকারের সব কাজ করা কি সম্ভব? অনেকে মনে করেন একটা সিটি করপোরেশনের মেয়র হচ্ছেন নির্বাহী প্রধান। তার প্রতিটি ওয়ার্ডে ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখা সম্ভব না। মেয়র বা প্রশাসক বোর্ড সভায় যে নির্দেশনা দেন সেগুলো মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করেন কাউন্সিলররা। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনায় মেয়র, কাউন্সিলর সবাইকে অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। তাই বর্তমান কাউন্সিলরবিহীন সিটি করপোরেশনে শুধু প্রশাসকই সর্বেসর্বা।

প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে নির্বাচনকে ঝুলে দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বেসরকারি সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, প্রশাসক নিয়োগ সমাধান না। রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসক করার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার এবং এসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় কর্তৃত্ব স্থাপনের ইঙ্গিত দেয়। 

তিনি বলেন, সরকারের উচিত ছিল নির্বাচন আয়োজনে অগ্রাধিকার দেওয়া। কিন্তু সেটি না করে যা করা হয়েছে সেটি হলো- দলীয় নেতাদের পুনর্বাসন। নির্বাচনের উদ্যোগ না নিয়ে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ ভালো ইঙ্গিত দেয় না। সরকারের উচিত দ্রুত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচন দেওয়া।

প্রসঙ্গত, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য সিটি করপোরেশনেও কাছাকাছি সময়ে নির্বাচন হয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯ অনুযায়ী, সব সিটি করপোরেশনের মেয়াদ অনেক আগেই পূর্ণ হয়েছে। আইনে মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন সিটির নির্বাচন নতুন সরকারের অধীনে প্রথম বড় স্থানীয় নির্বাচন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করবে। তবে নির্বাচনকে ঘিরে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসছে- ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সনদে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অধীনে পরিচালনার প্রস্তাব থাকায়, এটি বাস্তবায়ন না হলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়