শিরোনাম
◈ বাড়তি মার্কিন শুল্ক কার্যকর হলে রপ্তানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা ◈ শেখ হাসিনার পক্ষের দাবি নাকচ, জুলাই অভ্যুত্থান প্রতিবেদনের পাশে জাতিসংঘ ◈ কারামুক্ত হলেন সাবেক মেয়র আইভী ◈ দিল্লির আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত ২১; আহতদের মধ্যে ৫ বাংলাদেশি ◈ ‘আসল’ তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ঋতব্রতের হাতে, মমতাকে উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব ◈ অস্ট্রেলিয়ার বিরু‌দ্ধে বাংলা‌দে‌শের ওয়ান‌ডে দল ঘোষণা, মিরাজ অ‌ধিনায়ক ◈ বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ তুলে নিল সরকার ◈ হাজিদের লাগেজ চুরি রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ধর্মমন্ত্রীর ◈ ৩০০ দিনে ১৭ দেশ পেরিয়ে আর্জেন্টিনার ক্যাম্পে ৩ ভক্ত সাইক্লিস্ট  ◈ হাদি ইস্যুতে মমতার মন্তব্য; যা বললেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (ভিডিও)

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪৩ দুপুর
আপডেট : ০১ জুন, ২০২৬, ০৯:০০ সকাল

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

চাক‌রি হারা‌নো আর খারাপ জায়গায় বদ‌লির ভ‌য়ে পুলিশে আবার অস্থিরতা!

ডেস্ক রি‌পোর্ট : পুলিশ বাহিনীতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিবিধ কারণে এ অস্থিরতা চলছে। পুলিশের পেশার ধরনটাই অস্থিরতার এ কথা অনস্বীকার্য। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা অনেক বেড়েছে। এখনকার অস্থিরতা ভীতিজনিত কখন চাকরি চলে যায়, এই হচ্ছে ভয়। চাকরিহীন হয়ে পড়ার ভয় পুলিশ সদস্যদের তাড়া করছে। চাকরি হারালে পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে চলবেন, সমাজে অবস্থানই বা কী হবে এসব চিন্তা তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে সারাক্ষণ।

পুলিশের কেউ বলেছেন, ‘কখনো রাজনৈতিক আজ্ঞাবহ হয়ে দায়িত্ব পালন করিনি। সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করেছি। লোভনীয় কোনো পদেও ছিলাম না। কর্তৃপক্ষের নির্দেশানুযায়ী কাজ করেছি। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বলির পাঁঠা বানানোর চেষ্টা চলছে। তারপরও কাজ করছি। শুধু ভয় কখন চাকরি চলে যায়! প্রতিদিনই পরিবারের কাছে বলে আসছি চাকরি চলে গেলে ক্ষমা করে দিতে। এভাবে কী চাকরি করা যায়? যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তাদের কথা শুনতে হয় এটাই পুলিশের চাকরির নিয়ম। কিন্তু সরকারের কথা শুনতে গিয়ে কালোতালিকাভুক্ত হতে হচ্ছে। কালোতালিকাভুক্তি থেকে কবে পরিত্রাণ মিলবে?’

গত বুধবার সকালে ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বলেন ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা। নাম গোপন রেখে তিনি বলেন, ‘সরকারপ্রধান বাংলাদেশকে বদলে দিতে চান। অথচ পুলিশের ভেতরে থাকা একটি চক্র সরকারকে ভুল বুঝিয়ে পুলিশে আতঙ্ক তৈরি করছে।

ওই কর্মকর্তার মতো পুলিশের ঊর্ধ্বতন থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত সবাই অস্থির। কার কখন চাকরি যায় বা সংযুক্ত হওয়ার পাশাপাশি খারাপ স্থানে বদলি হয়ে যায় এ দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। গত বুধবার ১১ ডিআইজি ও দুজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পর আতঙ্ক আরও বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতনরা যদিও বলছেন, ‘যারা গত ১৭ বছর সরকারের লেজুড়বৃত্তি করেছে, তাদেরই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি জনবান্ধব পুলিশ গড়তে।

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় ছিল অন্তর্র্বর্তী সরকার। পুলিশের কিছু কর্মকর্তা আওয়ামী আমলেও ক্ষমতাধর ছিলেন, অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলেও তাদের প্রভাব কমেনি। তারা সব সরকারের লেজেই তেল মাখিয়েছেন। বিএনপি সরকার গঠন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে। বাহিনীর যারা সব সরকারের আমলেই সুবিধা নিয়েছে, তাদের বিষয়ে খোঁজ নিতে সরকারের উচ্চমহল থেকে গোপন বার্তা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী, পুলিশের দুটি ইউনিটসহ গোয়েন্দারা কাজ শুরু করেছে। 

তারা কয়েকজন অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টরসহ অনেক কর্মকর্তার বিষয়ে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করেছে। ওই সব কর্মকর্তা সব সরকারের আমলেই বিশেষ সুবিধা এবং পদোন্নতি নিয়ে ভালো স্থানে রয়েছেন। এখন ভোল পাল্টে বিএনপি আদর্শের কথা বলে সুবিধা নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এসব কর্মকর্তা বঞ্চিত বলে সুবিধা নিয়েছেন গোয়েন্দাদের গোপন তদন্তে জানা গেছে। আবার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঞ্চিত একাধিক পুলিশকর্তা অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলেও উপেক্ষিত ছিলেন। তারা দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন। পদোন্নতি না পাওয়ায় অনেকের ক্ষোভ ও হতাশা বেড়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজিসহ বিভিন্ন পদ খালি থাকা সত্ত্বেও নানা জটিলতায় পদোন্নতি হচ্ছে না। 

আবার আওয়ামী সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তা থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। বঞ্চিত কর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার পাশাপাশি ভালো স্থানে পদায়ন করা হয়েছে। ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ইন্সপেক্টর ও সাব-ইন্সপেক্টরের একাধিক পদ খালি থাকলেও ঊর্ধ্বতনদের সেদিকে নজর নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত বুধবার পুলিশের কয়েকটি ইউনিটে সরেজমিন গিয়ে একই দৃশ্য দেখা গেছে। অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে চুপচাপ ডিউটি করতে দেখা গেছে। নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা মনে করেছিলাম অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশের যে অবস্থা ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন কেন্দ্র করে পুলিশের মেরুদণ্ড অনেকটা ভেঙে গেছে। 

আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। কিন্তু হঠাৎ ১৩ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর পর নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরকারের উচিত দ্রুত বিষয়টির নিরসন করা। না হলে আমাদের আতঙ্ক দূর হবে না। আমাদের কাজে মন বসছে না। আবার সুবিধাভোগী পুলিশকর্তাসহ অন্য সদস্যরা আরও ভালো সুবিধা নিয়ে সরকারকে বিব্রত করছেন। বিষয়টি সরকারকে ভাবতে হবে।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় যেসব পুলিশ কর্মকর্তার বিতর্কিত ভূমিকা ছিল তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়। আওয়ামী লীগ আমলের শীর্ষ কর্তাদের চাকরিচ্যুত করার পাশাপাশি তাদের নামে মামলা হয়েছে। কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন, কেউ দেশের বাইরে চলে গেছেন।

শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে অবসরে পাঠনো হয়েছে বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মনিরুল ইসলাম, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম, মো. আনোয়ার হোসেন, সিটিটিসিপ্রধান মো. আসাদুজ্জামান, শিল্পাঞ্চল পুলিশের সাবেক প্রধান মাহাবুবর রহমান, সাবেক সিআইডিপ্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া, সাবেক ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্র, সিএমপির সাবেক কমিশনার কৃষ্ণপদ রায়, কেএমপির সাবেক কমিশনার মোজাম্মেল হক, কেএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার সরদার রাকিবুল ইসলাম, ট্যুরিস্ট পুলিশের সাবেক প্রধান মীর রেজাউল আলম, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার লুৎফুল কবির, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ, ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার, ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার ড. খ. মহিদ উদ্দিন, সিআইডির সাবেক ডিআইজি ইমাম হোসেন, নোয়াখালী পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবিরসহ আরও অনেককেই।

সর্বশেষ বুধবার পুলিশ স্টাফ কলেজের ডিআইজি ড. এএফএম মাসুম রব্বানী, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সাখাওয়াত হোসেন, রংপুর পিটিসির পলাতক কমান্ড্যান্ট (ডিআইজি) মহা. আশরাফুজ্জামান, এন্টি টেররিজম ইউনিটের (ঢাকায় সংযুক্ত) ডিআইজি এজেডএম নাফিউল ইসলাম, নৌপুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ আবুল ফয়েজ, এন্টি টেররিজম ইউনিটের ডিআইজি (ঢাকায় সংযুক্ত) মো. মনিরুল ইসলাম, পুলিশ একাডেমি সারদায় বদলির আদেশপ্রাপ্ত পুলিশ অধিদপ্তরের (টিআর) ডিআইজি মাহফুজুর রহমান, এপিবিএন সদর দপ্তরের ডিআইজি মো. মুনিবুর রহমান, ওএসডি ও বর্তমানে রংপুর রেঞ্জ অফিসে সংযুক্ত অতিরিক্ত ডিআইজি মো. ইকবাল হোসেন, পুলিশ অধিদপ্তরের (টিআর) ডিআইজি শামীমা বেগম, শিল্পাঞ্চল পুলিশের ডিআইজি আবু কালাম সিদ্দিক, পুলিশ টেলিকমের ডিআইজি মো. আমিনুল ইসলাম এবং এপিবিএনের (পার্বত্য জেলাসমূহ) ডিআইজি সালমা বেগমকে অবসরে পাঠানো হলে অস্থিরতা দেখা দেয়।

পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে। তার পরে রয়েছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। এ ছাড়া সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এসবির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিসি ইকবাল হোসাইন, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি এসএম মেহেদী হাসান, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, সহকারী পুলিশ কমিশনার, একাধিক থানার ওসি, ইন্সপেক্টর, এসআই ও কনস্টেবলদের নামে একাধিক মামলা হয়েছে। ঢাকার মধ্যে সর্বোচ্চ মামলা হয়েছে যাত্রাবাড়ী থানায়। মামলার সংখ্যা ৯১। তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে আন্দোলন দমাতে যে মাত্রার নির্দেশনা পেয়েছিলেন, তারচেয়ে প্রয়োগ করেছেন অনেক বেশি। তা ছাড়া সাবেক আইজিপি শহীদুল হকের বিরুদ্ধে সাতটি, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজনরা ভালো সুবিধা পাচ্ছেন। অনেকে এখন আওয়ামী লীগবিরোধী হওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ সফলও হয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে সরকার সুবিধাভোগী পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি।’ তিনি এ কথাও বলেন, ‘চাকরিচ্যুতদের মধ্যে অনেকেই পেশাদারত্ব নিয়ে কাজ করেছেন। তারা কখনো রাজনৈতিক দলের আদর্শ নিয়ে চাকরি করেননি। কোনো কোনো কর্মকর্তার অধীনে থেকে কাজ করায় কেউ কেউ বলির পাঁঠা হয়েছেন।

এমনকি বিভিন্ন স্থানে মামলার আসামি হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছু পেশাদার কর্মকর্তার নামও আছে। গত সরকারের আমলে তারা ভালো অবস্থানে থাকলেও কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। কিছু কর্মকর্তার কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আবার এমনও পুলিশ সদস্য আছেন, যারা সিনিয়র কর্মকর্তাদের গায়ে হাত তুলেছেন। সূত্র, দেশরূপান্তর

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়