শাহাজাদা এমরান,কুমিল্লা: কৃষক বন্ধু মতিন সৈকতের নামটি শুনলেই এক দিকে যেমন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শিরটি নত হয়ে যায় অপর দিকে কিছুটা হিংসেও হয় কেন এমন হতে পারলাম না এই ভেবে। একটা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে বেড়ে উঠা অধ্যাপক মতিন সৈকত আজ সারা দেশে কৃষক বন্ধু নামে বহুল পরিচিত। দরিদ্র কৃষকের প্রতি তার দরদ, পাখিদের প্রতি তার প্রেম ও পরিবেশের প্রতি তার অকৃপণ ভালোবাসা তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সহজ,সরল ও বন্ধু বাৎসল্য এই কৃষক বান্ধব এই মানুষটি তার কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ একাধিকবার সরকারি ভাবে কৃষি পদকে ভূষিত হয়েছেন।
এক কৃষক বন্ধুর অনন্য গল্প মতিন সৈকত—নামটা শুনলে প্রথমেই মনে পড়ে এক টুকরো সবুজ মাঠ, পাখির কোলাহল আর মাটির গন্ধ। তিনি পেশায় একজন কলেজ শিক্ষক। কিন্তু নেশায় কৃষক। কিন্তু সেই পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি একজন পাখি–বান্ধব মানুষ, পরিবেশবিদ এবং নিঃশব্দ এক আন্দোলনের সৈনিক।
কৃষিকাজ করতে গিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে তার যে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেটাই তাকে আলাদা করে চিনিয়েছে। যেখানে অনেকেই ফসলের লাভ–লোকসানের হিসাবেই সীমাবদ্ধ, সেখানে মতিন সৈকত ভাবেন জমির প্রাণ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, পাখির বাসস্থান আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা। তার জমিতে আজও নির্বিঘ্নে বসবাস করে নানা প্রজাতির পাখি। কীটনাশকের বদলে তিনি ব্যবহার করেন প্রকৃতি–বান্ধব পদ্ধতি। ফলে তার ক্ষেত শুধু ফসল ফলায় না, বাঁচিয়ে রাখে জীববৈচিত্র্যও। পরিবেশ রক্ষায় তার এই দীর্ঘদিনের কাজ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পেয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি চারটি সরকারি পুরস্কার অর্জন করেছেন—যা প্রমাণ করে, একজন সাধারণ কৃষকও চাইলে জাতীয় পর্যায়ে উদাহরণ হয়ে উঠতে পারেন।
তবে পুরস্কারের চেয়ে বড় পরিচয় হলো—তিনি কাজ করে যান নীরবে, প্রচারের আলো থেকে দূরে। মতিন সৈকতের সঙ্গে আমার পরিচয় সংবাদসূত্র ধরে, আজ থেকে বিশ বছরেরও বেশি সময় আগে। যখন কুমিল্লার বর্তমান সময়ের অনেক সাংবাদিক এই পেশাতে ছিলই না। তিনি তৎকালীন সময়ে মাত্র ২০০টাকার বিনিময়ে কৃষকদের সেচের পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। অবদান রেখেছেলেন স্বল্প মূল্যে ধান উৎপাদনের।
এই দীর্ঘ সময়ে তাকে কাছ থেকে দেখেছি—কখনো মাঠে, কখনো গাছ লাগানোর কর্মসূচিতে, কখনো পাখির বাসা রক্ষার সংগ্রামে। সময়ের সঙ্গে তার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে—প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। এই বিশ্বাসের সঙ্গে তিনি কোনো আপস করেননি। তিনি শুধু নিজে পরিবেশবান্ধব চর্চা করেন না, আশপাশের কৃষকদেরও উদ্বুদ্ধ করেন। তরুণদের নিয়ে কথা বলেন পাখি সংরক্ষণ, জলাশয় রক্ষা, বৃক্ষরোপণ নিয়ে। তার কাছে পরিবেশবাদ কোনো স্লোগান নয়, এটি জীবনের অংশ। আজকের সময়ে যখন জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল, বন উজাড় আমাদের অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, তখন মতিন সৈকতের মতো মানুষেরা আশার আলো দেখান। তিনি প্রমাণ করেছেন—পরিবেশ রক্ষার জন্য বড় পদ বা বড় বাজেট লাগে না, লাগে দায়বদ্ধতা আর ভালোবাসা। মতিন সৈকত আসলে একজন কৃষক বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু। তিনি আমাদের সময়ের একজন পরিবেশ–প্রহরী, যিনি মাটির কাছ থেকেই প্রকৃতির পক্ষে কথা বলেন। এমন মানুষেরাই আগামী দিনের সবুজ বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে দেন—নিঃশব্দে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে।
লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক , মুক্তিযুদ্ধ ও বৈষম্যবিরোধী লেখক।