শাহাজাদা এমরান, সম্পাদক (দৈনিক কুমিল্লার জমিন): বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক তিন বারের প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। যিনি পাক ভারত উপ মহাদেশে মাদার অব ডেমোক্রেসি ও আপোষহীন নেত্রী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। রাজনীতিতে একেবারেই আগ্রহ ছিল না তাঁর, ইচ্ছে ছিল না রাজনীতির মেঠোপথ হাঁটার । কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০মে তাঁর প্রিয় স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন কিছু বিপদগামী সেনা সদস্যের হাতে চট্রগ্রামে শহিদ হন,তখন জিয়া বিহীন বিএনপি মাঝি ছাড়া নৌকার মতো হয়ে যায়। এক প্রকার বাধ্য হয়ে দলের নেতাকর্মীদের প্রবল চাপে গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালের ৩ জুন বিএনপিতে যোগদান করেন। দল তাকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করেন। পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন বিএনপির। ১৯৮৩ সালে ৪০ বছর বয়সে বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। যা ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত অধিষ্ঠিত ছিলেন।
রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহ খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এলেন, ৪০ বছর রাজনীতি করলেন, দেশ ও জাতিকে জয় করলেন, তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রী হলেন, সারা বিশ্বের মানুষের কাছে মাদার অব ডেমোক্রেসি ও আপোষহীন নেত্রীর উপাধী পেলেন। অবশেষে দেশ বিদেশেরবিরল সম্মান নিয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। গতকাল (৩১ ডিসেম্বর) বুধবার রাজধানী ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিশ্বের ইতিহাসে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হলো বেগম খালেদা জিয়ার।
বেগম খালেদা জিয়া। দক্ষিণ এশিয়ার আপোশহীন নেত্রী, মাদার অব ডেমোক্রেসি আর বাংলাদেশের ঐক্যের প্রতীক ছিলেন। বর্নাঢ্য জীবনের অধিকারী বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে লিখার মত দৃষ্টতা কিংবা ন্যুনতম যোগ্যতা আমার নেই। আমি মনে করি এটা চেষ্টা করাও এক ধরনের ধৃষ্টতার শামিল।
বেগম খালেদা জিয়া এমন একজন নেত্রী ছিলেন, যিনি বলতেন কম কিন্তু কাজ করতেন বেশি। তাঁর আচরন, চলাফেরা, পরমতসহিষ্ণুতা গণতন্ত্রের প্রতীক তাঁর মত দেশপ্রেমী অকৃপণ বাংলাদেশের বন্ধু আর এদেশে কবে জন্ম নিবে জানিনা।
স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে তিনি বলেছেন, আমি এরশাদের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবো না। অনেক রাজনৈতিক ব্যাক্তিরা সেদিন বেইমানি করলেও তিনি নির্বাচনে যাননি।এজন্য স্বৈরাচার এরশাদের অনেক অত্যাচার, নির্যাতন, জেল জুলুম তাকে সহ্য করতে হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারী পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে অভাবনীয় সাফল্য নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনেও বিএনপি তাঁর নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালেও চার দলীয় ঐক্যজোট খালেদার নেতৃত্বে সাফল্য অর্জন করে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তিনি গোটা দেশের রাজনীতির কিংবদন্তীতে পরিনত হন।
২০০৭ সালে ১/১১ পর সেনা সমর্থিত মইনুদ্দীনের সরকার দুই ছেলেসহ তাকে বিদেশ পাঠিয়ে দিতে চাইলে তিনি রাজি হননি। সেদিন তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ ছাড়া আমার কোন জায়গা নেই। আমি মরলেও এখানে মরব, বাঁচলেও এখানেই বাঁচব। তারপর তাকে ও তাঁর দুই ছেলেকে আটক করে নির্মম নির্যাতন করে। মারাত্মক নির্যাতনের শিকার তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য বাইরে পাঠাতে হয়। আর ছোট ছেলে আরফাত রহমান কোকোকেও বিদেশে পাঠাতে বাধ্য করেন। বিদেশে থেকে বড্ড অবহলোয় মারা যান শহিদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্টপুত্র কোকো।
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের যে বাসায় ২০ বছরের অধিক সংসার ছিল খালেদা জিয়ার। শেখ হাসিনার সরকার প্রতিহিংসা করে সেই বাসা থেকে তাকে এক কাপড়ে বের করে দিয়েছে৷ ২০১৫ সালে আওয়ামিলীগ সরকারের বিরুদ্ধে যখন আন্দোনল তুমুল চলছিল তখন খালেদা জিয়ার বাসা ফিরোজার সামনে ১৪ টি বালুর ট্রাক দিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, বের হতে দেন নাই।
জীবনে চরম সংকটের মুহুর্তেও খালেদা জিয়া মাথানত করেন নি। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, আমি অল্প বয়সে স্বামী হারিয়েছি, কারাগারে থাকতে মা হারিয়েছি, ছেলেকে হারিয়েছি, আমার আরেক ছেলে লন্ডনে। সেদিন কান্নাভেজা কন্ঠে তিনি বলেছিলেন, আমার একমাত্র স্বজন হচ্ছে আমার দেশবাসী।স্বজনহীন আমার স্বজন হচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষ।
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মতো দেশপ্রেমিক, গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক নেতা এই বাংলাদেশ আবার কবে পাবে সময়ই তা বলে দেবে। তবে এই মুহুর্তে এতটুকু বলতে পারি, তাঁর মৃত্যুতে শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যে শূণ্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা সহজে পূরন হবার নয়।
আমি আপোষহীন নেত্রী কিংবদন্তী রাজনীতিবিদ বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। একই সাথে মহান আল্লাহকে বলছি, হে রব, তুমি বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায়ে যে সম্মান দিয়েছ , এখন তিনি তোমার অতিথি হয়েছেন। তোমার কাছেও তাকে একই সম্মান তুমি দান করিও। আমিন।