স্পোর্টস ডেস্ক : ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট থেকে দীর্ঘ ৩০০ দিন আর ১৭টি দেশ পেরিয়ে অবশেষে তা থামল কানসাস সিটিতে। ১০ হাজার মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে গত ২ জুন (মঙ্গলবার) নিজেদের গন্তব্যে এসে পৌঁছেছেন আর্জেন্টিনার তিন সাইক্লিস্ট—ভিসেন্তে কোনকুলিনি, ইয়ামান্দু মার্তিনেস এবং মিগুয়েল সিলিও।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের দেশের ফুটবলারদের সমর্থন জোগাতে এবং ফুটবল মহোৎসবের অংশ হতে এই দুঃসাহসিক যাত্রা করেন তারা। গত মঙ্গলবার কানসাস সিটির নেলসন-অ্যাটকিন্স মিউজিয়াম অব আর্ট থেকে সিপিকেসি স্টেডিয়ামের কাছে আর্জেন্টিনার টিম হোটেল পর্যন্ত শেষ কয়েক মাইলের যাত্রায় স্থানীয় সাইক্লিস্টরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ৫৬ বছর বয়সী মিগুয়েল সিলিও, ৪৯ বছর বয়সী ইয়ামান্দু মার্তিনেস এবং ২৯ বছর বয়সী ভিসেন্তে কোনকুলিনি এখন নিরাপদে তাদের গন্তব্যে। --- টি স্পোর্টস
এই সাইক্লিস্ট ত্রয়ীর যাত্রা শুরু হয়েছিল গত বছরের ১৬ আগস্ট, বুয়েনস আইরেস থেকে প্রায় ১৪০ মাইল উত্তরে অবস্থিত তাদের নিজ শহর গুয়ালেগুয়াইচু থেকে। হাড়কাঁপানো শীতের পোশাক, গরমের প্রস্তুতি আর বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জল-রসদ—সবকিছু সাইকেলের ক্যারিয়ারে বেঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন এই তিন ফুটবলপাগল ভক্ত। আগামী ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে আলবিসেলেস্তেদের (আর্জেন্টিনা দল) প্রথম ম্যাচের ভেন্যুতে পৌঁছানোর পর এখন তাদের শরীরজুড়ে শুধুই স্বস্তির বিশ্রাম।
এই তিন ভক্ত যখন ওকলাহোমা হয়ে সাইকেল চালিয়ে আসছিলেন, তখন তাদের সঙ্গে কথা হয় সংবাদমাধ্যম 'দ্য স্টার'-এর। কানসাস সিটিতে পৌঁছানোর পর তরুণ সাইক্লিস্ট কোনকুলিনি জানান, পথে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও আতিথেয়তা দেখে তারা রীতিমতো মুগ্ধ, ‘মানুষ যেভাবে আমাদের উৎসাহ দিতে এগিয়ে এসেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’ কোনকুলিনি আরও জানান, যাত্রাপথে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ মাইলেরও বেশি সাইকেল চালাতে হয়েছে তাদের, যার প্রতিটিতে ছিল প্রায় ৮০ পাউন্ড ওজনের রসদ ও সরঞ্জাম।
কেন সাইকেল বেছে নিলেন এই ভক্তরা? -----
মূলত এবারের বিশ্বকাপে লিওনেল মেসিদের প্রথম ম্যাচের ভেন্যুতে সশরীরে হাজির হওয়া এবং প্রিয় দলকে কাছ থেকে সমর্থন জোগানোই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। তবে কেন সাইকেল? ২৯ বছর বয়সী ভিসেন্তে কোনকুলিনির ভাষায়, ‘আমরা কিন্তু পেশাদার সাইক্লিস্টদের মতো কোনো ট্রেনিং নিইনি। আমরা স্রেফ ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসি, ফুটবলকে ভালোবাসি; আর এই দুই ভালোবাসাকে এক সুতোয় বাঁধার জন্য সাইকেলই ছিল আমাদের কাছে সবচেয়ে নিখুঁত মাধ্যম।’
যাত্রাপথে এই তিন ভক্ত ডেক্যাথলন ট্যুরিং ই-বাইক বা ইলেকট্রিক সাইকেল ব্যবহার করেছিলেন। যদিও এটি সনাতনী বা পুরোপুরি সাধারণ প্যাডেল চালিত সাইকেল ছিল না (এতে মোটর অ্যাসিস্ট ছিল), তবুও হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, তীব্র গরম ও ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘ ১০,০০০ মাইল পথ এভাবে পাড়ি দেওয়া অবিশ্বাস্য ও দারুণ এক কীর্তিই বটে।
কলম্বিয়া-পানামা সীমান্তে আকাশপথের সেই বিরতি ----
টানা ৩০০ দিনের এই যাত্রায় তারা সাইকেল চালিয়েছেন ল্যাটিন আমেরিকা থেকে শুরু করে মধ্য আমেরিকা হয়ে উত্তর আমেরিকা পর্যন্ত। তবে পুরো পথ কিন্তু মসৃণ ছিল না। কলম্বিয়া এবং পানামার মধ্যবর্তী দুর্গম ও ঘন জঙ্গল ‘দারিয়েন গ্যাপ’ কোনো যানবাহন বা সাইকেলে পার হওয়া অসম্ভব। বাধ্য হয়ে শুধু এই সীমান্তটুকু পার হতে তাদের প্লেনের সাহায্য নিতে হয়। এরপর পানামায় নেমে আবারও প্যাডেলে পা রাখেন তারা।
গন্তব্যে পৌঁছানোর সেই আবেগঘন মুহূর্ত ----
কানসাস সিটিতে আর্জেন্টিনার টিম হোটেলের সামনে যখন এই ত্রয়ী এসে পৌঁছান, তখন স্থানীয় সাইক্লিস্ট ও শত শত সমর্থক করতালির মাধ্যমে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। মহাদেশ পেরিয়ে আসা এই ‘বীরদের’ দেখে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ।
কঠিন এই যাত্রার সমাপ্তিতে আবেগাপ্লুত ৫৬ বছর বয়সী মিগুয়েল সিলিও বলেন, ‘পথটা ভীষণ কঠিন ছিল। তীব্র ঠান্ডা, প্রচণ্ড গরম আর ঝড়-বৃষ্টির মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাদের। কিন্তু দিনশেষে যখন এই প্রাপ্তি আর ভালোবাসা চোখে পড়ে, তখন মনে হয়—সত্যিই, প্রতিটা মুহূর্তের কষ্ট সার্থক হয়েছে!’
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আগামী ১৭ জুন বুধবার সকাল ৭টায় আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে। ম্যাচটি হবে কানসাস সিটির বিখ্যাত অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে।