অসীম শক্তি বা অনন্তকাল ধরে চলতে থাকা যন্ত্রের ধারণা মানুষের এক প্রাচীন প্রলোভন। এই অসম্ভব স্বপ্নের নাম 'পারপেচুয়াল মোশন মেশিন' বা 'চিরস্থায়ী গতির যন্ত্র'। বিজ্ঞানের ইতিহাসে বহুবার এই যন্ত্র তৈরির চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে 'ফ্রি এনার্জি' নামে যে ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ে, তার অধিকাংশই প্রতারণা। যমুনা টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে তাপগতিবিদ্যার মৌলিক সূত্রগুলোর আলোকে এসব দাবির অসারতা তুলে ধরা হয়েছে।
ঐতিহাসিক কল্পনা ও ব্যর্থতা:
ইতিহাসে, ১৩০০ শতকে ফরাসি স্থপতি ভিলার দ অকুর-এর 'ভারসাম্যহীন চাকা' এবং ১১৫৯ সালে ভারতীয় গণিতবিদ ভাস্করাচার্যের পারদ ভর্তি চাকার মতো নকশা তৈরি হয়েছিল।
ধারণা ছিল, চাকার একপাশে সবসময় বেশি ওজন থাকবে এবং এটি নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘুরবে। কিন্তু বাস্তবে যতবার এই যন্ত্র বানানো হয়েছে, ততবারই তা থেমে গেছে। তবে এই ব্যর্থ পরীক্ষাগুলো থেকেই ধীরে ধীরে বলবিদ্যা, টর্ক এবং তাপগতিবিদ্যার মতো আধুনিক বিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি জন্ম নেয়।
কেন সম্ভব নয় এই যন্ত্র?
তাপগতিবিদ্যার দুটি মৌলিক সূত্র অনুযায়ী, শূন্য থেকে শক্তি সৃষ্টি করা অসম্ভব:
শক্তির নিত্যতার সূত্র (প্রথম সূত্র): এই সূত্র অনুযায়ী শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এটি কেবল রূপ বদলায়। আপনি যদি কোনো যন্ত্রকে একবার ঠেলে দিয়ে আশা করেন সেটি চিরকাল চলবে, তবে প্রতিটি ঘূর্ণনে যে ক্ষুদ্র অপচয় হয়, তার ক্ষতিপূরণের জন্য অতিরিক্ত শক্তি তৈরি করা সম্ভব নয়।
এনট্রপি ও দক্ষতার সূত্র (দ্বিতীয় সূত্র): এই সূত্র আরও কঠোর। এটি বলে, কোনো বাস্তব প্রক্রিয়া শতভাগ দক্ষ হতে পারে না। ঘর্ষণ, বায়ু প্রতিরোধ, বৈদ্যুতিক রোধ, শব্দ বা তাপ ছড়িয়ে পড়ার মতো অপচয়গুলো কখনোই শূন্য করা যায় না। ফলে, সময়ের সাথে সাথে শক্তি খুঁয়ে যাওয়ায় যন্ত্রটি ধীর হবেই এবং থামবেই।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতারণা:
আজকের দিনে সামাজিক মাধ্যমে যে ভিডিওগুলোতে কোনো মেশিনকে শক্তির উৎস ছাড়াই চলতে দেখা যায়, তা মূলত মেজারমেন্ট এরর বা পরিমাপের ভুলের কারণে হয়ে থাকে।
অনেক ক্ষেত্রে লুকানো ব্যাটারি, সূক্ষ্ম মোটর বা বাইরের ইলেকট্রনিক স্টিমুলাস ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়।
চুম্বক ব্যবহার করে তৈরি যন্ত্রগুলো একদিকে লাভ দেখালেও, বস্তুকে আবার আগের অবস্থায় ফেরাতে একই পরিমাণ শক্তি খরচ হয়। তাই বাস্তবে লাভ শূন্যের কাছাকাছি থাকে।
বিজ্ঞানের বর্তমান লক্ষ্য: চিরস্থায়ী গতির যন্ত্র বাস্তবে নেই বলেই বিজ্ঞান থেমে যায়নি। বরং এই অসম্ভবতা আমাদের সীমাবদ্ধতা শিখিয়েছে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, উন্নত ব্যাটারি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে শক্তি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়াতে কাজ করছেন। মানুষ হয়তো কখনোই শূন্য খরচে অনন্ত শক্তি পাবে না, কিন্তু সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই প্রায় অনন্ত সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে।