শিরোনাম
◈ জাপানি কনসোর্টিয়ামের সাথে চুক্তি ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে, ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে চালু হচ্ছে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ◈ ইন্টারপোল রেড নোটিশভুক্ত নজরুল ইসলাম লিবিয়ায় গ্রেফতার ◈ এই বিজয় বাংলাদেশ ও গণতন্ত্রের বিজয়: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ-হত্যা: যে কারণে স্বপ্না হঠাৎ স্বামী সোহেল রানাকে মারতে তেড়ে যান ◈ তোফায়েলের জানাজা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, মুখ খুললেন হাছান মাহমুদ ◈ ন‌ভেম্ব‌রে ঢাকায় পুরুষ‌দের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল, থাক‌বে‌ ভিআরএস প্রযু‌ক্তি  ◈ হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন ইসরায়েলি শীর্ষ কর্মকর্তা ◈ ৬ নবজাতকের মৃত্যুর দায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ◈ নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফে অসন্তোষ, বিইআরসিকে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ মন্ত্রণালয়ের ◈ ‘আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’, মায়ের মৃত্যু নিয়ে প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন নিহতের ছোট ছেলে বুয়েট অধ্যাপক

প্রকাশিত : ০৪ জুন, ২০২৬, ০৮:১০ রাত
আপডেট : ০৪ জুন, ২০২৬, ১১:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দেশে আনঅফিশিয়াল সাবস্ক্রিপশন ব্যবসা কেন এত জনপ্রিয় হচ্ছে?

চড়া সাবস্ক্রিপশন ফি ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট পদ্ধতির সুযোগ তেমন না থাকার কারণে প্রিমিয়াম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সফটওয়্যারের অফিশিয়াল সেবার খরচ বহন করা অনেকের পক্ষেই কঠিন। ফলে এ ধরনের এআই ও সফটওয়্যার টুল ব্যবহারের জন্য দেশের বিপুলসংখ্যক ফ্রিল্যান্সার, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখন অনানুষ্ঠানিক রিসেলার নেটওয়ার্কের দিকে ঝুঁকছেন।

এই ক্রমবর্ধমান বাজারটি দেশের অর্থনীতিতে ডিজিটাল টুলের ওপর বাড়তে থাকা নির্ভরশীলতারই প্রতিফলন। তবে এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে ব্যবহারকারীরা সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিতেও পড়ছেন।

আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর অফিশিয়াল সাবস্ক্রিপশন নিতে সাধারণত আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মার্কিন ডলারে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। তবে অনেক বাংলাদেশির জন্যই এই সুবিধা এখনো নাগালের বাইরে কিংবা বেশ ঝামেলার। এই শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে স্থানীয় রিসেলাররা। 

এই রিসেলারররা পাইকারি হারে সাবস্ক্রিপশন কেনে, ফ্যামিলি বা টিম প্ল্যান ব্যবহার করে অথবা কম মূল্যের অঞ্চল থেকে প্যাকেজ সংগ্রহ করে। এরপর বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে দেশীয় মুদ্রায় সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে সেগুলো আবার বিক্রি করে।

অফিশিয়াল মূল্যের সাথে এই রিসেলারদের দামের পার্থক্য অনেক বেশি। চ্যাটজিপিটি প্লাসের অফিশিয়াল খরচ যেখানে প্রতি মাসে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার মতো, সেখানে স্থানীয় রিসেলাররা এটি সাধারণত মাত্র ৪০০ টাকার কাছাকাছি বিক্রি করছে। ক্যানভা প্রো ও ভিপিএন সেবাগুলোর অফিশিয়াল মাসিক খরচ ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে হলেও রিসেলারদের কাছে তা ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

একইভাবে একজন সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য ইউটিউব প্রিমিয়ামের অফিশিয়াল ব্যয় প্রতি মাসে ২৩৯ টাকা হলেও শেয়ারড অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তা মিলছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। এছাড়া নেটফ্লিক্সের প্রিমিয়াম ফোর-কে প্ল্যানের অফিশিয়াল মাসিক খরচ যেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা, সেখানে শেয়ারড প্রোফাইলের মাধ্যমে তা প্রায় ৪৫০ টাকায় পুনঃবিক্রয় করা হচ্ছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। বার্ষিক প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই খাত বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ফ্রিল্যান্স শ্রমবাজারে পরিণত করেছে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অভ রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন ইন সোশ্যাল সায়েন্স-এ প্রকাশিত ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ফ্রিল্যান্সারের মাসিক আয় ২০৯ ডলারের কম। ফলে একইসাথে একাধিক সফটওয়্যারের অফিশিয়াল মূল্য পুরোটা পরিশোধ করা তাদের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়।

ফ্রিল্যান্সার সৌরভ বিশ্বাস টিবিএসকে বলেন, 'অধিকাংশ ফ্রিল্যান্সারের জন্য একসঙ্গে বেশ কয়েকটি টুলের সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মূল্য পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।'

অপরিহার্য হয়ে উঠছে ডিজিটাল টুল

নিত্যদিনের কাজের সাথে এআই ও ডিজিটাল প্রোডাক্টিভিটি প্ল্যাটফর্মগুলো যেভাবে যুক্ত হচ্ছে, তাতে অনেক ব্যবহারকারী এখন প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশনকে বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য প্রয়োজন হিসেবে দেখছেন।

ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সিগুলো ডিজাইন ও কনটেন্ট তৈরির টুলের ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে ফ্রিল্যান্সাররা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সেবা দিতে এআই ও লেখালেখিতে সহায়তাকারী প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন। শিক্ষার্থীরাও অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন ও গবেষণার কাজের জন্য দিন দিন এসব টুলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

একুশ কমিউনিকেশনের নির্বাহী পরিচালক তানভীর হাসান জানান, এজেন্সি পরিচালনার জন্য প্রিমিয়াম সফটওয়্যার এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

'কনটেন্ট টিমগুলো ডিজাইন, কপিরাইটিং, প্রেজেন্টেশন, ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগ ও কাজের দক্ষতা বাড়াতে এগুলো ব্যবহার করে। এআই টুলগুলো বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের সময় অনেকটাই কমিয়ে এনেছে,' বলেন তিনি।

তানভীর আরও বলেন, একাধিক কর্মী রয়েছে এমন ছোট এজেন্সিগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সব প্ল্যাটফর্মের অফিশিয়াল সাবস্ক্রিপশন অব্যাহত রাখা প্রতি মাসে বড় ধরনের আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনিরুদ্ধ বিশ্বাস বলেন, অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষেই ব্যক্তিগতভাবে অফিশিয়াল সাবস্ক্রিপশনের খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। 

'খরচ কমানোর জন্য সাধারণত একদল শিক্ষার্থী মিলে স্থানীয় বিক্রেতাদের মাধ্যমে সাবস্ক্রিপশন কেনেন,' বলেন তিনি।

কয়েকজন ফ্রিল্যান্সার ও শিক্ষার্থী জানান, এসব টুলের ব্যবহার বৈশ্বিক ডিজিটাল বাজারে তাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সামর্থ্যকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

চাহিদা বাড়াচ্ছে ডিজিটাল বৈষম্য

রিসেলার প্রতিষ্ঠান বঙ্গ ডিজিটালের চেয়ারম্যান মো. নেয়ামুল হাসান মিমু বলেন, গত কয়েক বছরে চ্যাটজিপিটি প্লাস, ক্যানভা প্রো, অ্যাডোবি-র বিভিন্ন পণ্য, স্পটিফাই ও গ্রামারল-এর সাবস্ক্রিপশনের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে।

তার প্রতিষ্ঠান এখন প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ জন গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে।

তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর কাছে এখনো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট কার্ড নেই। তাছাড়া ডলারের চড়া দামের কারণে অফিশিয়াল সাবস্ক্রিপশনগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বেশি পড়ে।'

বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় মুদ্রায় বিল পরিশোধের ব্যবস্থা চালু করা এবং দেশীয় পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোকে যুক্ত করার আহ্বান জানান নেয়ামুল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক বি এম মাইনুল হোসেন বলেন, রিসেলার বাজারের এই প্রবৃদ্ধি মূলত বিস্তৃত ডিজিটাল বৈষম্যকেই তুলে ধরছে।

তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বৈশ্বিক মূল্য নির্ধারণ অনেক সময়ই অত্যন্ত বেশি হয়। যদি আঞ্চলিক মূল্য নির্ধারণ বা লোকালাইজড অ্যাকসেস মডেল চালু করা না হয়, তাহলে অনেক ব্যবহারকারীই এসব সেবার খরচ মেটাতে পারবেন না।'

মাইনুল আরও বলেন, ডিজিটাল সেবাগুলো যখন আর্থিকভাবে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে থেকে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই অনানুষ্ঠানিক সমান্তরাল বাজার গড়ে ওঠে।

নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলনামূলক কম দাম হলেও রিসেলার সেবাগুলোতে সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।

মাইনুল সতর্ক করে বলেন, শেয়ার করা অ্যাকাউন্টগুলোর কারণে ব্যবহারকারীদের ব্রাউজিং হিস্ট্রি, প্রম্পট ও ব্যক্তিগত তথ্য অন্যদের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। কিছু আনঅফিশিয়াল লগইন পদ্ধতি ম্যালওয়্যার ছড়াতেও সাহায্য করতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, অনেক গ্রাহকই অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তার চেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন।

তিনি আরও বলেন, কিছু রিসেলার গ্রাহকদের ইমেইল ক্রেডেনশিয়াল, পাসওয়ার্ড, এমনকি তাদের ডিভাইসের রিমোট অ্যাকসেসও চেয়ে থাকেন। এতে পরিচয় চুরি, অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশ ও ক্রেডেনশিয়ালের অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।

টিবিএসও লক্ষ্য করেছে যে, কিছু 'গ্রুপ-বাই' সেবা ব্রাউজার এক্সটেনশনের ওপর নির্ভর করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ ধরনের এক্সটেনশন ব্যবহারকারীদের ব্রাউজিং সেশন, কুকিজ ও অ্যাকাউন্টের কার্যকলাপে প্রবেশাধিকার পেয়ে যেতে পারে।

মঈনুদ্দিন বলেন, 'এওব আনঅফিশিয়াল সাবস্ক্রিপশন বাজারকে আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় মনে হলেও ব্যবহারকারীদের বুঝতে হবে যে কম খরচের বিনিময়ে প্রায়ই সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সঙ্গে সুপ্ত আপস করতে হয়।'

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বাজারের অন্যতম বৃহৎ অপারেটর গ্রুপ বাই সার্ভিসেস-এর সাথে সঙ্গে করেছিল টিবিএস, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

নিয়মকানুনের অনিশ্চয়তা

এই বাজারটি বর্তমানে অস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। শেয়ারড সফটওয়্যার-অ্যাজ-আ-সার্ভিস সাবস্ক্রিপশনের পুনঃবিক্রয়ের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অধীনে সর্বজনীনভাবে জ্ঞাত কোনো সুনির্দিষ্ট লাইসেন্সিং কাঠামো নেই।

বারবার চেষ্টার পরও কমিশন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টিবিএস কোনো মন্তব্য নিতে পারেনি।

সাবস্ক্রিপশন পুনঃবিক্রয় করা যদি অবৈধ না-ও হয়; অননুমোদিত ক্রেডেনশিয়াল শেয়ারিং, ক্র্যাক করা সফটওয়্যার বা চুরি করা পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহারের মতো কাজগুলো প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা, কপিরাইট সুরক্ষা বা সাইবার অপরাধ আইন লঙ্ঘন করতে পারে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়