কল্যাণ বড়ুয়া, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বৈলছড়ি ইউনিয়নের ঐতিহাসিক চেচুরিয়ার আদর্শ গ্রাম খাল প্রশাসনের পর পর কয়দিনের অভিযানে অবশেষে দখলমুক্ত হয়ে তার স্বাভাবিক গতিপথ ফিরে পেয়েছে। ১৯৭৭-৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে খনন করা এই খাল দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, কৃষি ও জলনিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ বাঁধ নির্মাণ ও মাছ চাষের অপচেষ্টার কারণে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বিগত কয়দিনের প্রশাসনের পৃথক পৃথক অভিযানে শফিকুর রহমান (৫০) নামের এক ব্যক্তিকে খালের ওপর অবৈধ বাঁধ নির্মাণ এবং এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি কাটার সময় হাতেনাতে আটক করা হয়। তিনি খালটিকে বিভক্ত করে মাছ চাষের পরিকল্পনা করছিলেন। এ অপরাধে তাকে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এর ৫(১) ধারা লঙ্ঘনের দায়ে একই আইনের ১৫(১) ধারায় ২ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড এবং ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
পরে অভিযান পরিচালনাকালে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পুরো খালজুড়ে শতাধিক ছোট-বড় বাঁধের অস্তিত্ব দেখতে পান। তদন্তে আরও জানা যায়, খালের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট প্লট তৈরি করে ঝাঁক দিয়ে মাছ চাষের অপচেষ্টা চলছিল, যা খালের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে এবং বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছিল।
উল্লেখ্য, এই খাল দিয়ে বৈলছড়ি ইউনিয়নের পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি জলকদর খাল হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। ফলে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা, কৃষি ক্ষতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে সব অবৈধ বাঁধ ও ঝাঁক অপসারণের নির্দেশ দেয়। ৩০ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত টানা তিনদিনের অভিযানে খালের শতাধিক পয়েন্ট থেকে সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়। এর ফলে খালের পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হয় এবং স্থানীয় পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে।
স্থানীয় বেশ কয়জন নাম প্রকাশ করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরে খালটি দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন তারা। অবশেষে প্রশাসনের এই উদ্যোগে তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। এতে কৃষি জমিতে পানি নিষ্কাশন সহজ হবে, জলাবদ্ধতা কমবে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা পাবে।
পরিবেশবিদদের মতে, প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল সংরক্ষণ শুধু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং বৃহত্তর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত মাছ চাষ জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রশাসনের এই অভিযানকে পরিবেশ সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। তারা আশা করছেন, ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হবে।